Breaking News
Home / Breaking News / কবি ময়ুরী মিত্র এর লেখা “চড়াই আর কড়াইশুঁটি”

কবি ময়ুরী মিত্র এর লেখা “চড়াই আর কড়াইশুঁটি”

চড়াই আর কড়াইশুঁটি

ঠিক বারোয় পড়েছি তখন | ঐ বয়সেই একটা নয় বছরের মেয়ে জুটল আমার | | দুর্দান্ত দুরন্ত | কিম্ভুত সাজপোশাক | কোনোদিন যদি ঘেরওয়ালা ফ্রকের সাথে একটি পকেটওয়ালা খোকাপ্যান্ট পরল তো আরেকদিন কেশহীন মস্তকে বাঁধল একটি চকরাবকরা রিবন | পাড়ার খুড়িপিসিদের খবর ছিল – মা ছাড়াই মামা মাসীদের কাছে মানুষ হচ্ছিল মেয়েটা | তার মা তাকে ফেলে কোথায় গেল , আবার কোনোদিন ফিরবে কিনা,মা ছাড়া তার কত দুঃখ হয় এসবে কৌতুহল না দেখিয়ে প্রথম দিনই ফট করে ঠিক করে নিলাম এ মেয়ের মা হয়ে যাব আমি |
নাম দিলাম পুঁটি | সে হল আমার পুঁটি মেয়ে | পুঁটি মেয়েকে লালন করা কিন্তু সোজা হয়নি আমার পক্ষে | প্রথম কথা বারো বছরের মা আর নয় বছরের মেয়ে | আমি যদি তার ইজেরের ইলাস্টিক টেনেটুনে ঠিক করে দি তো সে তৎক্ষণাৎ আমার ঘটিহাতা ছোট্ট ব্লাউসটার টিপবোতাম লাগিয়ে দেবে | আমি যদি তাকে কদবেল জারিয়ে খাওয়াই তো সে আমায় দলা পাকিয়ে গেলাবে সরস্বতী পুজোর চালমাখা | কাঁচা চাল ভেজা — মুগডাল যত ফালতু জিনিষ গিলে মরো এবার | দ্বিতীয় কথা হল – তার মা যে নেই এবং বাকিদের মা আছে , এই থাকা না থাকার গ্যাপটাই ধরতে পারছিল না সে | শোকতাপের বালাই তো নেইই ,দিনরাত রাক্ষসী হাসি হেসেই চলেছে | আহা রে মা নেই – কোনোরকমে এরকম একটা অনুভুতি তৈরি করে যখনি তার মাথায় বিলি কাটতে গেছি ফিনফিনে চুল দুলিয়ে ছুট লাগিয়েছে পুঁটি মেয়ে | দুদিনের মধ্যে আর এলই না মোটে আমার কাছে | মায়ের আদরে তার এমনি অনীহা যেদিন আদর আদর বাই চাপত আমার , বিনাবাক্যে আমায় কষিয়ে দিত চড় | ব্যাস এবার তার বারো বছরের মাও মারপিটে নেমে পরল |
পারছিলাম না | পারছিলাম না | কিছুতেই মা হওয়ার খেলায় জিততে আর পারছিলাম না | এরই মাঝে বড় মাঠে দুধেল গাই মরল | পুঁটি মেয়ের বায়না – মরা গরুর চোখ কেমন খুলে থাকে তাই দেখবে | বলাবাহুল্য পুঁটিমেয়ের এইসব বিদিকিচ্ছিরি আবদারে পরের দিকে আর তেমন অবাক হতাম না আমি | মাকে লুকিয়ে দুজনে মিলে গেলাম মরা গাই ঘাঁটতে | হাতপা ছড়িয়ে কাঁদছে গরুর পালক | হিহি করে হাসছে রাক্ষসী পুঁটি | মুখ চেপে ধরে আছি হতভাগির | হঠাৎ হাত ছাড়িয়ে সে দৌড় দিল অনেকটা দূরে একা ঘুরতে থাকা একটা বাছুরের দিকে | হাঁ করে দেখল খানিক | তারপর টেপফ্রক তুলে গোল্লা পাকিয়ে বানাল এক ঘেরাটোপ | ছোট্ট মুণ্ডু পুরো ঢুকিয়ে হাউহাউ করে কাঁদতে লাগল| কত করে বোঝাল সবাই – বাছুরটা মৃত গাভীর নয় | এর মা বেঁচে আছে | তবুও কাঁদল পুটি | চোখ খোলা মরা মায়ের পাশে যে কোনো এক বাচ্চার একা হয়ে থাকাটাই কাঁদাল তাকে | কাঁদতে কাঁদতে হেঁচকি উঠে গেল তার | শিকনি বেরিয়ে গেল ফতফত |
সেদিন পুঁটিমেয়ে মাঠের মাঝেই দুম করে চড়ে বসলো তার পুঁটিমায়ের কোলে | আর মাঠের মাঝেই দিকবিদিক ভুলল পুঁটিমা |

error: Content is protected !!

Powered by themekiller.com