Home / Breaking News / একটি অটো রিক্সার নিঃশর্ত মুক্তি

একটি অটো রিক্সার নিঃশর্ত মুক্তি

সন্ধ্যা হয়নি তখনও কিন্তু মনে হচ্ছে গভীর রাত,বৃষ্টির পড়ছেতো পড়ছেই, মেঘ অন্ধকার করে ফেলেছে দিনের সব আলো,এমন বৃষ্টিমুখর এক দিনে,ফয়সাল ভাবছে,
আজ পার্টি অফিসে যাবে-এতো বৃষ্টি হচ্ছে বলেই যাবে, লোকজন কম হবে, তাছাড়া রাজনৈতিক অভি-নেতারাও কম আসবে। এই সুযোগে জেলার কিছু লিডারদের সাথেও কিছু গুরুত্বপূর্ন বিষয় নিয়েও আলোচনা করা যাবে। ফয়সালের দিন ভালো যাচ্ছে না। অভাব অনটন আছে, দলের নেতৃবৃন্দের কাছে এবং সাধারন মানুষের সাথে ফয়সালের কখনই দূরত্ব নেই। দলের খরার সময়ই তার রাজনীতি,মানুষের কল্যানেই রাজনীতি এটা সে মনেপ্রানে বিশ্বাস করে। জেল খেটেছে,সে, নিজের জন্য নয়,দলকে ভালোবাসার অপরাধে,পুলিশের নির্যাতনের শিকার হয়েছে সব কিছুই দলের জন্যই,-
ফয়সাল বৃষ্টির দিকে তাকিয়ে ভাবছে নির্ধারিত
মিটিং যেহেতু সুতরাং মিটিং হবেই। সুসময়ের পাখীরা পার্টি অফিসে আজকে নাও আসতে পারে,
বর্ষায় রবীন্দ্রনাথের সফট গান বাজিয়ে হয়তো আরাম করবে-
ফয়সাল তরুন ছাত্র নেতা, রাজনৈতিক মাঠে সুবিধা বঞ্চিত লিডার সে। রাজনৈতিক কৌশলে একটি ভিন্ন মাএার পরিবর্তন লক্ষ্য করছে ফয়সাল। বিষয়টি ধরতে পেরেও সেই কঠিন পরীক্ষায় ফয়সাল বারবার ফেল করছে। দলের বিপরীত ভূমিকায় যারা ছিলো যাদের দলের দুঃসময়ে ভূমিকা মাএ ছিলোনা তাদের আজ দলে ভালো অবস্থান, ভালো পদ,ভালো সুবিধা সবকিছুই ভালো, বড় নেতার আস্থাভাজন ঘনিষ্ঠ সহচর হয়েছে বিশিরভাগ নতুন মুখ। কেউ কথার খৈয়ে বড় নেতার মন যুগিয়ে ফেলেছে,এখন কামাই রোজগার ভালো, একদল দুইটা ভোটও তাদের আচরণে কিংবা কাজ দিয়ে মানুষকে আকৃষ্ট করে দলের জন্য দুইটা ভোট জোগার করতে পারেনি, কোনো কালেও।কিন্তু ফেসবুকে লিখে নেতার খুব কাছে চলে গেছেন। ব্যাস তারও এই সুসময়ে আঙুল ফুলে কলা গাছ। ইতিমধ্যে আবার এমন কিছু ব্যাবসায়িক নতুন অতিথি পাখী দেখা যাচ্ছে, যারা দলের পদ,পদবী নিজেরাও দখল করছে অন্য ভারাটিয়াকেও তাদের সাথে সাবলেট করছে,ফলে প্রকৃত তৃণমূল ঘরছাড়া হয়ে রোহিঙাদের মতো অবস্থায় আছে। ফয়সাল, ফায়সালা করতে পারছেনা কিভাবে সম্ভব? কিভাবে বড় লিডার দলের আদর্শ,দলের নীতি বিক্রি করে সাধু সেজে আছেন?আর নতুন আমদানীদের কাছে তৃনমুলেরা ও দলের নিবিদিতরা জিম্মি হয়ে গেছে। ফয়সাল সব বুজে,সব জানে,সব জ্ঞানই রাখে,কিন্তু অধিকারের জায়গায় যখন রোহিঙ্গাদের মতন রাজনীতিতেও আগমন,অনুপ্রবেশ হলো, হচ্ছে এবং তাদের জ্ঞান এবং ধ্যানে যখন বড় নেতা অন্ধ হয়ে তাদের গুরুত্ব দেয়,তখন ফয়সাল,কষ্ট,অপমান অনুভব করে।
ঘৃনায় ফিরে আসে নেতার কাছ থেকে। বিবেকের দহনে শুধু নিজেকে প্রশ্ন করে, এমন চিন্তা করতে করতে ফয়সাল তৈরি হচ্ছিলো,
ঠিক এমন সময় দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ হয়, বৃষ্টিতে ভিজে আধবয়সী একজন মানুষ কান্না জড়িত কন্ঠে বলে উঠলো, ফয়সাল ভাই,ভাইগো আমার জীবনডা বাঁচান? ফয়সাল বললো কি হয়েছে? ভাই আমার অটোরিকশা পুলিশে থানায় নিয়া গেছে? কেনো নিছে? ভাই রেজিষ্ট্রেশন নাই,এই জন্য,
ফয়সল বৃদ্ধ লোকটির দিকে তাকাল,হাড্ডিসার শরীর, ভূখা পেট, চোখ কঠোরে ডুকে গেছে, শ্রমজীবী এই মানুষটির কাঁদতেও কষ্ট হচ্ছে, বৃষ্টির পানি লোকটির মাথা ও শরীর থেকে বৃষ্টির মতোই পড়ছে,
ফয়সাল লোকটির চোখের দিকে তাকালো,লোকটির মাথা ও শরীর থেকে যে বৃষ্টির পানি পড়ছে, তার সাথে চোখের অশ্রুর ফোটাও স্পষ্ট বোঝা যায়,
বৃষ্টির জলের সাথে দরিদ্রের অশ্রু ফোটাও মেশে যায়,
ফয়সালের মনে হয় এই চোখের জলের রং কেমন যেনো লাল, আর ভিষন অপুষ্টির,
ফয়সাল নিজেকে তাগাদা দেয় ধূর কি ভাবছি,
ফয়সাল বৃদ্ধ লোকটি কে চেনে জানে,
কয়েকদিন আগে গাছ থেকে পড়ে তার ছেলেটি মরে যায়, গাছ থেকে পড়ে সরাসরি মরে গেলেও হতো,কিন্তু তা হয়নি তার ছেলেটা চিকিৎসা বাবদ অনেক খরচ করিয়ে ফেলে,তার অভাবি জীবনে, যদিও ডাক্তার ছেলেটিকে আবার যেতে বলেছিলো,মানুষটি ঠিকও করেছিলো যাবে, কিন্তু সেই যে টাকার প্রয়োজন, তাই এলাকার লোকজন বলেছিলো,বড় রাস্তার ধারে ছেলেটিকে বসিয়ে দাও, আমরা একটা হুইল চেয়ার কিনে দেই, হলোও তাই,টাকা ভালোই উঠতে লাগলো,
যাওয়ার দিন তারিখও ঠিক হলো, কিন্তু হঠাৎ তার ছিলেটি বড় রাস্তার পাশে হুইল চেয়ারেই মরে পরে থাকে।
ফয়সালের সেদিনও মনে হয়েছিল ইস আরও কয়েকটা দিন পড়ে মরলে কি হতো? যেভাবে মানুষ সাহায্য করছিলো, কিছু টাকা এই হাড্ডিসার মানুষটির রয়ে যেতো,তিন মেয়ে, বউ, ছেলের ঘরের নাতি,
এতো গুলো মুখ তাদের খাওয়া,ক্ষিধা সবার খেয়াল রাখা এই হাড্ডিসার বৃদ্ধের উপর ন্যাস্ত।
বৃষ্টি কমছে না, ফয়সাল বললো,
আলফাজ ভাই ভিতরে আসেন? না ভাই চলেন? ফয়সাল বললো বসেন, গামছা দেই মাথা মোছেন, যাবো, বৃষ্টি থামুক, আলফাজ ভাই বললো,না ভাই বসবো না, গাড়ীটার চিন্তায় কিছু ভালো লাগছেনা।ফয়সাল বললো ঠিক আছে যাবোতো? গাড়ী নিয়ে এতো টেনশন কিসের?
আলফাজ বললো, শুনেছি ১০ দিনের আগে নাকি এবার ছাড়বো না। মহাসড়কে উন্নয়নের কাজ হইতাছে,
দশদিন লাগবো শেষ হইতে।
ফয়সাল বললো, তাহলে এনে কি করবেন?
চালাতে তো পারবেন না।
আফজাল ভাই বললো,চালানের দরকার
নাই ভাই,গাড়ীটা চারজ(চার্জ)না দিলে এই দশদিন ব্যাটারী বইসা গেলে আমি কি করমু ভাই। এই বলে আফজাল ভাইয়ের গলা ভারী হয়ে আসে,
ফয়সাল বললো আপনি রেজিষ্ট্রেশন ছাড়া চালাতে গেলেন কেনো?আলফাজ ভাই বললো ভাই গাড়িটা কিস্তি তুলে কিনছি,সপ্তাহে একহাজার টাকা কিস্তি।রেজিষ্ট্রেশন করার জন্যও তো টাকা লাগবে।
ফয়সাল বললো ঠিক আছে, দেখছি কি করা যায়।এই বলে, সে ফোন হাতে নিলো, কল করলো মোবাইলে
ও পাশ থেকে, হ্যালো, আরে তৃনমুলের লিডার যে, কি মনে করে?
ফয়সাল বললো, কেমন আছেন?
হুম ভালো আছি এখনতো ভালো থাকার সময় তাইনা
তবে খুব ব্যাস্ত সময় যাচ্ছে মানুষের কতো কাজ করতে হয়।
আপনাকে বললাম আপনি আমার সাথে একটা লিয়াজু রাখেন,নেতার সাথে তো আমি আছি,ভালো হতো আপনার।
ফয়সাল বললো আপনিতো ব্যাবসায়ী। আমিতো
ব্যাবসা করিনা,ব্যাবসা করলে যোগাযোগ রাখতাম। আমি রাজনীতি করি এখনও করে আসছি ভবিষৎতেও করবো।
ওপাশ থেকে বললো, ফয়সাল ভাই আপনি দেখেন একটা পরিবর্তন হচ্ছে ,নেতাও পরিবর্তন চায়, নতুন করে রাজনীতি গোছাবে। আর লিডার তো আপনাকে পছন্দ করে,আপনিতো দূরে থাকেন?
ফয়সাল বললো আমরা দূরে থাকিনা,কিন্তু হাইব্রিডরা, সুযোগ সন্ধানিরা, এবং রাজনৈতিক দেউলিয়ারা,
তোষামদকারী এদের ভিড়ে আমাদের দেখা যায়না।
ওপাশ থেকে ফয়সাল কে বললো,লিডারের সাথে আমি রাজনৈতিক ও ইকোনোমিক ব্যালেন্স নিয়ে এগুচ্ছি কতোগুলো কমিটির পরিবর্তন হয়েছে আপনি দেখেছেন নিশ্চয়?
ফয়সাল বললো আপনার ব্যাবসায়িক রাজনীতি থাকলে আপনি লিডারের সাথে ব্যাবসায়িক রাজনীতি করেন,মাঠের রাজনৈতিতে আপনারা কেনো আসবেন? দল তো ব্যাবসায়িক প্রতিষ্ঠান নয়
আমীর ভাই?
আমীর ভাই হোহোহো করে হাসলো, আর বললো অনেকেই আসছে আমাদের সাথে? আর আমাদের লিডার আপনার মতো জনপ্রিয় নির্লোভ তৃনমুল আসলে আমরা মুল্যায়ন করতে দ্বিধা করবো?
ফয়সাল বললো আমাদের দল এতো দেউলিয়া হয়নি ব্যাবসায়ির দ্বারা তৃনমুলকে মুল্যায়ন করতে হবে।
আমীর সাহেব আবার হাসলো হোহোহো।
ফয়সাল বললো যাক সে কথা,থানায় একটা ফোন দিতে হবে? আমীর সাহেব বললো কি ব্যাপারে?
ফয়সাল বললো একটা অটোরিক্সা থানায় আছে অটোরিক্সা থানায় আটকানো টোকেন নাম্বারটা দিচ্ছি,রেজিস্টেশন নেই বলে থানায় আটকে আছে,আমীর সাহেব আবার হাসলো হোহহো করে তারপর বললো-
ঠিক আছে নাম্বারটা দিন?
ফয়সাল আলফাজ ভাই থেকে টোকেন নাম্বার নিলো
আমীর ভাইকে দিলো-০৮৪০।
আমীর ভাই বললো ওকে লিডার ফোন দিচ্ছি।
ফয়সাল বললো লিডারকে এটাও বলবেন থানায় যে সকল অটোরিকশা আছে সেগুলোও যাতে ছেড়ে দেওয়ার ব্যাবস্থা করে ওরা দিনমজুর উন্নয়নও চলবে
শ্রমিকের হাতও কাজ করবে। সুতরাং এটা নিয়ে লিডার’কে চিন্তা করতে বলবেন।
আমীর ভাই আবার হাসে,হোহোহো ফয়সালের মনে হয় কি নোংরা হাসি।
ফয়সালের মনে হয়,আমীর ভাই ফোন দিবে না।
এতো ছোট কাজে আমীর ভাই ফোন দেওয়ার লোকও না।
ফয়সল আলফাজ ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে বললো,
বৃষ্টি মনে হয় কমবে না, চলেন থানায় যাই?
ওসিকে বুজিয়ে বলবো নিশ্চিই ছেড়ে দিবে।
আলফাজ ভাই বললো,এমপির প্রতিনিধি আমীর ভাই কি বলছে?
ফয়সাল আলফাজ ভাইয়ের দিকে হেসে বললো-
০৮৪০ এই নব্বরের আটক কৃত অটোরিকশার নিঃশর্ত মুক্তি চাই থানার সামনে গিয়ে এই শ্লোগান দিতে বলছে।
আলফাজ আশ্চর্য হয়ে ফয়সালের দিকে তাকিয়ে
বলে কি বলেন ভাই?সহজ লোকটি যখন সহজ রসিকতাটা বুজতে পারেনা ফয়সাল মনে মনে আনন্দ পায়।
ফয়সাল বললো চলেন বের হই। আলফাজ বললো ভাই আপনি ছাতা নিয়ে বের হন?
ফয়সাল বললো আমার ছাতা নেই ।
আলফাজ বললো,মেঘে ভিজাই যাইবেন? ওসি সাব কি কইবো? কইবো নেতার বুজি একখান ছাতা নাই?
ফয়সাল হাসতে হাসতে বললো,
ওসি সাহেব কে আমি বলবো,
জনগনের মাথায় ছাতা ধরতে গিয়ে আমি ভিজে গেছি। আলফাজ হেসে ওঠে।
সেই হাসি বড় বড় প্রশান্তির বড়,সরল
এই বৃষ্টির জলের মতন,নরম।
ফয়সালের মনেহয়,
হাড্ডিসার শরীর যখন ভাবনাহীন হাসতে জানে।
সেই হাসি হয় তুলনাহীন,
চাঁদের হাসির মতোই তুলনাহীন।
লেখকঃ
দেওয়ান মাসুদ রহমান।
১/৭/২১

error: Content is protected !!

Powered by themekiller.com