Home / Breaking News / ফরিদগঞ্জে করোনাকালেও শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে নানাখাতে ফি তোলার অভিযোগ

ফরিদগঞ্জে করোনাকালেও শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে নানাখাতে ফি তোলার অভিযোগ

আবু হেনা মোস্তফা কামাল, ফরিদগঞ্জ: করোনা পীড়িত সময়ে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে ছয় শত টাকা হারে বিদ্যুৎ ফি আদায় করেছেন কলেজ কর্তৃপক্ষ। ১৩৩৯ জন শিক্ষার্থীর কাছ থেকে বিদ্যুৎ ফি আদায় করা হয়েছে বলে অধ্যক্ষ ড. মোহাম্মদ মোহেববুল্লাহ খান স্বীকার করেছেন। এছাড়াও, উন্নয়ন, গবেষণাগার, সাংস্কৃতিক, এ্যাসাইনমেন্টসহ বিভিন্ন খাতে ফি হিসেবে টাকা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। করোনা পীড়িত এ সময়ে মাউশি’র নির্দেশনা উপেক্ষা করে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে বিভিন্ন সময়ে বিদ্যুৎসহ নানাখাতে ফি আদায়ের ঘটনায় হতবাক অভিভাবক মহল সন্তানের ভবিষ্যতের দিকে চেয়ে দাবীকৃত টাকা দিতে বাধ্য হয়েছেন। অধ্যক্ষ বলেছেন, কিছু শিক্ষার্থীকে ছাড় দেয়া হয়েছে। কিন্তু, বর্তমান ও প্রাক্তন কিছু সংখ্যক শিক্ষার্থী প্রতিবাদের ঝড় তুলেছেন। তারা ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়েছেন। এতে এলাকায় তোলপাড় চলছে এবং ঘটনাটি ভাইরাল হয়েছে। ফরিদগঞ্জ উপজেলার এ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নাম গৃদকালিন্দিয়া হাজেরা হসমত ডিগ্রি কলেজ। অবশ্য, ফি আদায়ের ছাপানো রিসিটের উপরেরদিকে প্রতিষ্ঠানের নাম ‘গৃদকালিন্দিয়া হাজেরা হাসমত বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ’ উল্লেখ করা হয়েছে।

২০২০ সালের নভেম্বর মাসের ২৪ তারিখে সরকারের মাউশি কর্তৃক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে (এম.পি.ও.ভূক্ত ও এম.পি.ও. বিহীন) প্রেরিত এক বিজ্ঞপ্তি (স্মারক নম্বর: ৩৭.০২.০০০০.১০৫.১৮.০০১.১৮/১৩০৯) মাধ্যমে জানিয়েছে, করোনা পীড়িত এ সময়ে একাদশ-দ্বাদশ শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে টিউশন ফি (বেতন) গ্রহণ করবে। কিন্তু, পুনঃ ভর্তি, গ্রন্থাগার, বিজ্ঞানাগার, ম্যাগাজিন ও উন্নয়ন বা কোনো ফি গ্রহণ করবে না। করা হলে, ফেরত দেবে অথবা তা বেতনের সাথে সমন্বয় করবে। বিশেষভাবে বলা হয়, যদি কোনো অভিভাবক চরম আর্থিক সংকটে পতিত হন, তাহলে তার সন্তানের বিষয়টি প্রতিষ্ঠান বিবেচনায় নেবেন। কোনো শিক্ষার্থীর শিক্ষা জীবন যাতে ব্যাহত না হয়, এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সকলকে যত্নশীল হতে হবে।

প্রতিবাদি শিক্ষার্থীরা দাবী করেছেন, ২০২০-২০২১ শিক্ষা বর্ষে একাদশ শ্রেণিতে অনলাইন ভর্তি আবেদন শুরু হয় আগস্ট মাসের ৯ তারিখে। কিন্তু, কলেজ কর্তৃপক্ষ জুলাই মাসে পাঁচ শত টাকা আদায়ের মধ্য দিয়ে কলেজ থেকে ‘ভর্তি ফরম বিতরণ’ করেন এবং জমা নেন। যদিও, ভর্তির প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয় অনলাইনের আবেদন মোতাবেক। ফরমে আবেনকারীদের সকলে কলেজে ভর্তিও হতে পারেননি। ওই পাঁচ শত টাকাও কাউকেই ফেরত দেয়া হয়েনি। এদিকে, বর্তমান প্রথম বর্ষে ভর্তির সময়ে সকল বিভাগ থেকে ভর্তি ফি এক হাজার এবং উন্নয়ন ফি পনর শত টাকা নেয়া হয়। ২০২০ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ভর্তি প্রক্রিয়া শেষ হয়ে অনলাইন ক্লাস শুরু হয় অক্টোবর মাসে। ডিসেম্বর মাসে অনলাইন ক্লাসের জন্য প্রতি মাসে শিক্ষার্থী প্রতি একশত টাকা এবং এককালীন বিবিধ চারশত টাকা আদায় করা শুরু হয়। এছাড়া, ‘গবেষণাগারের জন্য’ বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে এক হাজার এবং মানবিক ও হিসাব শাখার শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে পাঁচশত টাকা হারে আদায় করা হয়েছে।

শিক্ষার্থীরা অভিযোগ করেছেন, এপ্রিল মাসে উপবৃত্তির আবেদন ফরম বিতরণ করা হয়। ওই ফরম বিতরণের সময়ে প্রত্যেকের কাছ থেকে বিদ্যুৎ ফি ছয়শত এবং সাংস্কৃতিক ফি একশত টাকা জমা নেয়া হয়। যে সকল শিক্ষার্থী উক্ত টাকা দিতে ব্যর্থ হয়েছেন তাদেরকে উপবৃত্তির ফরম দেয়া হয়নি। এ কারণে অনেকেই উপবৃত্তির আবেদন করতে পারেননি। শিক্ষার্থীরা আরও দাবী করেছেন, মূল্যায়ন পরীক্ষার জন্য এ্যাসাইনমেন্ট দেয়ার সময়ে একইভাবে প্রত্যেকের কাছ থেকে বিদ্যুৎ ফি ছয়শত এবং সাংস্কৃতিক ফি একশত টাকা নেয়া হয়েছে। যে সকল শিক্ষার্থী উক্ত টাকা দিতে পারেননি তাদেরকে এ্যাসাইনমেন্ট দেয়া হয়নি।

এদিকে, ২০১৯-২০২০ শিক্ষা বর্ষের শিক্ষার্থী- যারা বর্তমানে দ্বিতীয় বর্ষে আছেন। তাদের কাছ থেকে উন্নয়ন ফি দুই হাজার টাকা নেয়া হয়েছে।

শিক্ষার্থীরা আরও জানিয়েছেন, ২০২০ সালের মার্চ মাসে তখনকার একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের ফাইনাল পরীক্ষার রুটিন ঘোষণা করা হয়। এ জন্য শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে ছয়শত টাকা হারে পরীক্ষার ফি নেয়া হয়। কিন্তু, করোনার কারণে প্রতিষ্ঠান ও পরীক্ষা বন্ধ হয়ে যায়। উত্তোলিত এবং অব্যয়িত ওই ছয় শত টাকা টিউশিন ফি (বেতন)-এর সাথে সমন্বয় করা হয়নি ফেরতও দেয়া হয়নি।

এদিকে এ কলেজের শিক্ষার্থীরা জানিয়েছেন, প্রতিষ্ঠান কর্তৃক একের পর এক টাকা উত্তোলন করার ফলে প্রতিষ্ঠানের ভেতরে ও বাইরে এ নিয়ে চাপা ক্ষোভ চলতে থাকে। তারা মাউশি’র বিজ্ঞপ্তির সন্ধান পান। এরপর, কিছু সংখ্যক শিক্ষার্থী এ বিষয়ে আপত্তি তুলতে শুরু করেন। কিন্তু, টাকা উত্তোলন বন্ধ না করে বরং তাদের নানাভাবে হেনস্তা করা হয়। এতে, তরিকুল ইসলাম শাওন নামের একাদশ শ্রেণির ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থী তার নামের ফেসবুক আইডি থেকে ৪ঠা জুন শনিবার একটি স্ট্যাটাস আপলোড করেন। ওই স্ট্যাটাসটি ভাইরাল হয়ে পড়ে। স্ট্যাটাস এর প্রতি নিরবে প্রায় সকল শিক্ষার্থী ও অভিভাবক মহল সমর্থন করেন। তবে, বর্তমান ও প্রাক্তন বেশ কিছু শিক্ষার্থী ওই স্ট্যাটাসে প্রতিষ্ঠানের কর্মকান্ডের সমালোচনা ও তীর্যক মন্তব্য করেন। প্রাক্তন শিক্ষার্থী তন্ময় ইসলাম সজিব মন্তব্য করেন: “এদের দুর্নীতির বিরুদ্ধে অভিযোগ দেওয়া উচিৎ থানায় কিংবা জেলা প্রশাসকের কাছে”। মতিউর রহমান খোকন মন্তব্য করেছেন, “আরও একবার দুর্নীতির শিকার হতে চলেছে গৃদকালিন্দিয়া কলেজ স্টুডেন্ট”। অধ্যয়নরত এক ছাত্র মন্তব্য করেছেন, “পরেশ স্যারের সাথে বিদ্যুৎ বিল নিয়ে প্রশ্ন তুললাম। পরিশেষে আমি নিজেই অপমানিত। একজন টিচারের কথাবার্তা এতো উগ্র হতে পারে সেটা ওনাকে দেখেই বুঝতে পারলাম”। এ রিপোর্ট লেখা (বৃহস্পতিবার বিকাল) পর্যন্ত এই স্ট্যাটাস-এ মন্তব্য করেছেন ৭৩ জন। শেয়ার হয়েছে ৫৩ টি। এছাড়া, আরও কয়েকটি পেইজে একই অভিযোগে লেখালেখি চলছে। তরিকুল ইসলাম শাওনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমাদের শ্রদ্ধেয় শিক্ষকগণ ও পিতামাতা অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে শিখিয়েছেন। আমি মনে করি সকল শিক্ষার্থীর পক্ষ থেকে এ প্রতিবাদ করা আমার নৈতিক দায়িত্ব। যত হুমকি আসুক আমি পিছ পা হবো না।

এ ব্যপারে উপাধ্যক্ষ ও কলেজের ইউ.আই.ডি ও বেতন কার্যক্রম এর একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণির কমিটির কনভেনার মুনির চৌধুরী বলেছেন, শিক্ষকরা খারাপ ব্যবহার করেছেন, রাগ হয়ে দু’/এক কথা বলতে পারেন। তবে, আমাদের কাছে কোনো অভিযোগ আসেনি।

অনলাইন ক্লাস, বিদ্যুৎ, সাংস্কৃতিক, গবেষণাগারসহ নানা বিষয়ে উত্তোলিত টাকার বিষয়ে অধ্যক্ষ ড. মোহাম্মদ মোহেববুল্লাহ খান এর কক্ষে বসে কথা হয়। তিনি বিভিন্ন খাতওয়ারী ফি উত্তোলনের বিষয়টি অকপটে স্বীকার করেছেন। তবে, আত্মপক্ষ সমর্থন করে বলেন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকলেও নানা খাতে ব্যয় বন্ধ নেই। আমাদের ১৫/১৬ জন খন্ডকালীন শিক্ষক ও ৭/৮ জন কর্মচারীর বেতন দিতে হিমসীম খাচ্ছি। তাই বাধ্য হয়ে আমরা শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে কিছু টাকা তুলেছি। তিনি দাবী করেন যারা টাকা দিতে পারেনি। তাদের জোর করা হয়নি। কয়েকটি প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ফি দিতে না পারলে কাউকে উপবৃত্তির ফরম, এ্যাসাইনমেন্ট বিতরণ করা হয়নি এমন অভিযোগ সত্য নয়। কারও সাথে দুর্ব্যবহার করা হয়ে থাকলে আমি জানি না। একাদশ শ্রেণিতে ভর্তির জন্য ফরম বিতরণ এবং পাঁচশত টাকা জমা নেয়া হয়নি। অন্যান্য অভিযোগও তিনি একইভাবে অস্বীকার করেছেন।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে, কলেজ গভর্ণিং বডির সদস্য খোরশেদ আলম বলেছেন, গভর্ণিং বডির অনুমোদনক্রমে অধ্যক্ষ সাহেব ফি তুলেছেন।

এ ব্যপারে মুঠোফোনে জানতে চাইলে উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার আলী আশরাফ বলেন, আমাকে নয়, এটা জানাতে হবে জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসারকে। জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার গিয়াস উদ্দিন পাটওয়ারী বলেন, এটা উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসারকে জানান। তারা এছাড়া অন্য কোনো মন্তব্য করতে চাননি।

এদিকে, কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ডের কলেজ পরিদর্শক প্রফেসর জহিরুল ইসলাম মুঠাফোনে বলেন, লিখিত অভিযোগ পেলে আমরা তদন্ত করে ব্যবস্থা নিতে পারবো। এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, বেতন ছাড়া অন্য কোনো ফি আদায় না করতে মাউশি’র সার্কুলার প্রতিষ্ঠানে পাঠানো হয়েছে।

অতিরিক্ত সচিব ফজলুর রহমান (মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা) বলেছেন, লিখিত অভিযোগ পেলে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

error: Content is protected !!

Powered by themekiller.com