Breaking News
Home / Breaking News / দুই বাংলার বৃহত্তম নেটওয়ার্ক দৈনিক শব্দনগরের আজকের সেরা ছয় সাহিত্য

দুই বাংলার বৃহত্তম নেটওয়ার্ক দৈনিক শব্দনগরের আজকের সেরা ছয় সাহিত্য

শিরোনামঃ বার্ধক্য!
কলমঃ কনককান্তি মজুমদার
তারিখ -২৬শে মে ২০২২

অনেক স্মৃতিই এখন ধূসর,
কত কিছুই হারান প্রাপ্তির নিরুদ্দেশে ;
সময়টা ঢলে পড়েছে অস্তাচলের অন্তরালে।
মানুষটার দিন চলে খুঁড়িয়ে,
রাতের আঁধার নামে অনিশ্চিতে ;
আলো আঁধারির রাত ভোরে
মন বলে,
আবার একটা দিন আসছে ;
একটানা ক্লান্তির অবসর।
চলার পায়ে ব্যথার বেড়ি,
বলায় করায় অনেকের বিরক্তির কারণ ;
আস্ত একটা অস্বস্তিকর উপস্থিতি !
তবুও থাকা !
যে থাকায় বিজলীর চমক নেই,
বিচ্যুতির শাসন আছে ;
প্রতিবন্ধকতা প্রতিপদে।
অপ্রয়জনীয় জগদ্দল পাথর,
না হোমে না যজ্ঞে ;
জলন্ত এক উপদ্রব।
এরই নাম বার্ধক্য…!

——————————————–

# বিভাগ = কবিতা
# শিরোনাম=ব্যতিক্রমী সমাজ
# কলমে=প্রশান্ত কুমার শীল
# তারিখ=২৬/০৫/২০২২
******************************
******************************
ব্যতিক্রমী সমাজ এখন
উল্টো নিয়মে চলে,
জ্ঞানীজনকে বাদ দিয়ে
মূর্খের কথা বলে।

যোগ্য ব্যক্তি পায়না আসন
পাড়ার অনুষ্ঠানে,
অযোগ্য কে আদর করে
বসায় সিংহাসনে।

টাকার জোরে নিরক্ষরও
পন্ডিত হয়ে যায়,
শিক্ষিত গরীব মানুষেরা
সম্মান নাহি পায়।

যোগ্যতার নাই কোন দাম
এই সমাজে হায়,
অযোগ্য সব ছেলে মেয়েরা
চাকরি পেয়ে যায়।

গরীব ঘরের ছেলে মেয়েরা
অনেক কষ্ট করে,
লেখাপড়া শিখে বেকার থাকে
টিউশনি করে মরে।

নেতার ঘরের ছেলে মেয়েরা
ওদের আত্মীয় স্বজন,
অনায়াসে চাকরি পেয়ে যায়
ওরাই তো গুণীজন।

মানুষে মানুষে এতো বৈষম্য
ছিল না তো আগে,
ন্যায্য কথা বললে ওদের
ফেটে পড়ে ওরা রাগে।

জানি না কবে ফিরে পাবে
প্রকৃত যোগ্যরা সম্মান,
অযোগ্য কে সম্মান দেওয়া?
সেতো,যোগ্যতার অপমান।

——————————————–
স্বপ্নরা বেঁচে থাকে নিঃশ্বাসের সাথে
এম এম শাহানূর হোসেন
২৬/০৫/২০২২ ইং
“”””””””””””””'””””””””””””””
মন কেমনের অনুভূতিটা ভাষাহীন,
ভাষাহীন ভাষায় কেবলই নিজের সঙ্গে কথা বলা,
আর আনমনে পথ চলা।
সেদিন সম্বিত ফিরে পেয়ে একটা কথাই মনে হয়েছিল , ভালোবাসার চেয়ে মূল্যবান পৃথিবীতে আর কিছুই নেই।

দূরত্বে প্রেম মরেনা, অবসরে ম্যালে পাখা,
অতীত জীবন্ত হয়, খুলে শাখা-প্রশাখা।
বাতাসের ডাকে ঘুম ভেঙে যায়,
কূল পাবে না জেনেও অকুলের নাও বায়——-
বাকী যা আছে- খুচরো পয়সার ঝনঝনানি,
শুধু শব্দই করে।

আজ আমার হাতে অনেক সময় কিন্তু
বাউল বাতাস ঝড় হয়ে ভেঙে দিয়েছে কার্নিশের টপ। বিস্তীর্ণ বাগান ধুলিস্যাৎ হয়েছে জীবনের খরায়।
চাইলেও আর মালা গাঁথা হবে না।
বিষণ্ণ বিকেল সন্ধ্যায় এখন আর প্রসন্ন হয় না,
চাঁদের আলো আনে না কোনো স্বপ্ন,
উদোম জোছনা উদোম রয়ে গেছে
শুধু আমার আসেনা কোনো লগ্ন।

যাকে বাঁচাতে গিয়ে তোমার ডাক শুনতে পারিনি,
সে আর নেই, শ্যামল কাকা মারা গেছে।
শুনেছি অনাথ আশ্রম টা খুব ভালো চলছে ,
তোমাকে হারাবার পর সেখানেও আর যাওয়া হয়না।
আসলে,উপলব্ধি এবং প্রাপ্তির দ্বন্দ্ব ছন্দের পতন ঘটায়।
আকাঙ্ক্ষা হয়ে যায় অনাথ। যোগ্যতা তখন ফেরি করে জীবনের মানে।
কেউ কিনে না,উল্টা কপালে লিখে দেয়, হাঁদারাম।

এখন আমি দুঃসাহসী,
দ্বিধা সংকোচকে জয় করতে শিখেছি কিন্তু তোমার ডাক আর আসেনা -তপন দাঁড়াও ,আমার কিছু কথা আছে।
বর্ষায় কোকিল ডাকে না, এ কথা জেনেও ভাবি, যদি ডাকে।
আর এই যদির মধ্যে লুকিয়ে থাকে ভালোবাসার অমরত্ব। কেউ তার ঠিকানা পায় কেউ আবার পায়না।
ঢাকা-১২০৮

——————————————–
গল্প
“রমা ”
কলমে- রীতা ব্যানার্জি
২৬.০৫.২০২২

উত্তরে চওড়া বাঁধাই রাস্তা,তারই গা ঘেষে উঠেছে আড়াইতলা প্রকাণ্ড দত্ত বাড়ী। বাড়ির দক্ষিণে অর্থাৎ সামনের দিকে সান বাঁধানো উঠোন।উঠোনে র প্রাচীর শেষ হলেই এই বংশের কূল দেবী মা শীতলার মন্দির। পূর্বে প্রধান দরজা, দরজার বাম পাশে বসবার জন্য সিমেন্ট দিয়ে তৈরী একটি বেঞ্চ।তাতেই স্বচ্ছন্দে রানীর মতো শায়িত রমার পোষা বিড়ালিনী।
উত্তরে চওড়া রাস্তা পার হলেই বিশাল মাঠ।সেখানে ই বাঁধা দত্ত বাড়ীর দুগ্ধবতী গাভীও তার বাছুর ছানা।রমা ‘আই সি ডি এস ‘দিদিমণি, সকালে ডিউটি সেরে এসেই,নিত্য দিনের অবসর হীন তার সংসার-সংগ্রাম ।
না মেয়ে নয়,দত্ত বাড়ির বড় বউ রমা।সংসারের সকল কাজের দায়িত্বের চাবি তার আঁচলে বাঁধা।সকলের প্রিয় সে,আর হবে নাই বা কেন,একটা মানুষ সকলের মন রাখতে রাখতে কখন যেন রোবট হয়ে যায়।যন্ত্রের মতো অন্যের ফরমাস মিটাতে থাকে।ডিউটি থেকে ফিরেই স্নান সেরে শীতলা মাতার নিত্য সেবার পাঠ।মায়ের সকালে নিত্যসেবা ও সন্ধ্যায় শীতল আরতি হয়।দুই বেলাই রমা পূজার যোগাড়ে সহযোগিতা করে ঠাকুরমশাইকে।আর বাকী সময় তার রান্নাঘরেই,
এটাই তার আকাশ, বাতাস, তার সকল অস্তিত্বের নীগূঢ় সাক্ষী ।

মাঝে মাঝে মনে হয় রমা কি সত্যিই রক্ত মাংসে গড়া একটা মানুষ, ওর কি সত্যিই কোন অনুভূতি আছে? ও দুঃখেও কাঁদে না, সুখেও হাসে না,প্রশংসাতেও গলে না ।ওর হৃদয়টা কি সত্যিই পাথর হয়ে গেছে। কত প্রশ্নই মাথার মধ্যে ভিড় করে আসে। ওকে দেখলে একটা চাপা কষ্ট আমাকে নিরন্তর পীড়া দিতে থাকে। ও যে আমার ছোটবেলার সঙ্গী, মেয়ে বেলার বকুলফুল।কি প্রাণ উচ্ছল ছিল মেয়েটা,কি মিষ্টি ছিল হাসিটা। এক আকাশ কথা যেন ভীড় করে থাকত ওর ডাগর দুটো চোখে।

বাপের বাড়ি এলেই দেখা হতো আমাদের।কতবার জানতে চেয়েছি ওর মনের কথা, ওর শ্বশুববাড়ী,ওর স্বামীর কথা।ততবারই এড়িয়ে গেছে একথা ওকথায়। সেবার পূজার সময় বিজয়া দশমীতে গিয়েছিলাম ওদের বাড়ি। সেখানেই ফিরে পেলাম আমার সেদিনের বকুলফুলকে। শুনলাম তার নিদারুণ দুঃখ ব্যাথা, অঝোরে কেঁদে ছিলাম দুজনে।
বর্ষার মেঘের মতো আঁখি পল্লব কালো হয়ে উঠেছে তার, ঝরঝরিয়ে শ্রাবণ ধারার মতো বলে চলল তার দুঃখ গাথা।
জানিস, ছোট বেলায় বাপের বাড়ীর সবাই বলত রমা খুব আদরের। তিন জন দিদির কোলে তিন ভাই তারপর সর্বকনিষ্ঠ আমি। বড়দির ছোট ছেলে রামু ও মেজদির মেয়ে মুন্নি আমারই সমবয়সী হবে। বাবা’মার যথেষ্ট বয়সে আমি হয়েছি। তিন দিদির বিয়ে, তাদের ছেলেপুলে, দাদাদের পড়াশুনা,সংসার, সন্তান প্রভৃতির ব্যস্ততায় আমার প্রয়োজন অপ্রয়োজন ,ভালো মন্দ কোথায় যেন ঢাকা পড়েছিল এক অদৃশ্য চাদরে।
তবুও ঐ এক অনাবশ্যক অন্তঃসারশূন্য শব্দ রমা খুব আদরের!
খুব অভিমান হতো আমার, সবার উপেক্ষা, অবহেলা, এড়িয়ে যাওয়া, গুরুত্ব না দেওয়া, এসব যদি আদর হয়, তো তাই!

পড়াশুনার ক্ষেত্রেও, দাদারা উচ্চ শিক্ষিত হলেও আমাকে দেখানোর মতো এত তুচ্ছ কাজে তাদের কোন প্রবৃত্তি ছিল না।
বাবা হঠাৎ হৃদ রোগে মারা যান। তারপর দাদাদের সংসার। সেখানে অবিবাহিত অসুন্দর বোনের প্রতি কোন দাদা বৌদির অহেতুক ভালোবাসার উদ্রেগ হয়? কেবল সবাই মুখে স্নেহ উৎপাদনকারী ঐ শব্দ ব্যবহার করত। রমা আমাদের সবার খুব আদরের।
এমনি করেই একান্ত নিজের চেষ্টায় বিয়ে পাশ করলাম,অনার্স নেওয়ার মতো আতিশয্য আমার কপালে জুটল না।
ছোটদার ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার খরচ, মায়ের অসুখ অনেক দেনা হয়ে যায়। দুবিঘা জমি ও বিক্রি করতে হয় । মেজ বৌদি এক সংসারে থাকতে না চাওয়ায় মেজদা অন্যত্র বাসাবাড়ি নিয়ে থাকতে শুরু করে ।
ছোট দাদাও বড়লোকের একমাত্র মেয়েকে বিয়ে করে ঘরজামাই হয়ে শ্বশুরবাড়িতেই রয়ে যায় ।
এদিকে আমিও দু- একটা টিউশন পড়াই, এমনি করেই কখন যেন বয়স তিরিশের কোঠা ছুঁয়ে যায়। মা অত্যন্ত অসুস্থ হয়ে বিছানা নিয়েছে। চরম অসুস্থ অবস্থায় বড়দাকে কেবল আমার বিয়ের জন্য অনুরোধ করতে থাকে। এদিক ওদিক থেকে দুএকটা সম্বন্ধ আসে, কিন্তু গ্রামাঞ্চলে তিরিশ ঊর্ধ, অসুন্দর মেয়ের উপার্জনশীল পাত্র পাওয়া খুবই দুষ্কর হয়ে পড়ে। উপার্জনশীল পাত্র ছেড়ে এবার বেকার অথচ স্বচ্ছল পরিবারে সম্বন্ধ শুরু হয়। আর তখনই এই দত্ত পরিবার আমাকে বউ হিসেবে মনস্থ করে। এক সপ্তাহের মধ্যেই খানিকটা অনাড়ম্বর ভাবেই দত্ত বাড়ীর বড়বউ হয়ে আসি।
আমার শ্বশুর বাড়িতে শ্বশুর ,শাশুড়ি আর ওরা তিন ভাই। একটা দীর্ঘশ্বাস নিয়ে নির্বিকার চিত্তে বলে চলল রমা । বাইরে তখনও অঝোরে বৃষ্টি পড়ছে , আর ভেতরে পুরো একটা শ্রাবণ মেঘের চাপা অভিমান।
তবুও রমা বলে চলে ওরা তিনভাই ওএক বিবাহিত ননদ, মেজ ভাই দুবছর আগেই কলকাতায় এক নার্স মহিলাকে বিয়ে করে সেটেল। ছোট ভাই পড়াশুনা করছে, আর ননদ নন্দাই দুজনেই আমাদের বাড়িতে থাকেন । কারণ ননদ সন্তান সম্ভবা, ওদের প্রত্যন্ত গ্রামে বাড়ি, তাই এই মিনি টাউনে ভাড়া নিয়ে না থেকে আমাদের বাড়িতেই থাকে। নন্দাই এখান থেকেই অফিস যায় ।
আর রইল, এ বাড়ীর বড় ছেলে, শাশুড়িমার বড় খোকা, তিনি সারাক্ষণ লোকজন নিয়ে ব্যস্ত, তিনি যে বিপক্ষ রাজনৈতিক দলের ছোট খাটো নেতা ।
বিয়ের পর অষ্টমঙ্গলায় একদিনের মতো বাপের বাড়ি গেছিলাম, শাশুড়িমা বলেছিলেন বউমা তুমি এ বাড়ীর বড় বউ তোমার অনেক দায়িত্ব,স্বযত্নে পালন করো এবং সকলের মন জিতে নিও।সেদিন আমি কথা গুলো মন্ত্রমুগ্ধ হয়েই শুনেছিলাম ,বাপের বাড়িতে যে আমার খুব বেশিদিন থাকার ইচ্ছা ছিল তা নয়,কারণ তিরিশ বছরেরও বেশি সময় ঐ একঘেয়ে, অপাংক্তেয় জীবনের ক্লান্তি থেকে মুক্ত হয়ে, যা হোক নতুন এ জীবন ,নতুন গৃহের টান আমাকে সেদিন হয়তো বেশিই টেনেছিল , তাই আজ অবধি এ বাড়ীতেই সুখে, দুঃখে,চরম অপমানেও কেমন অভ্যস্ত হয়ে গেছি।
এখনো এত বছর পরেও বাড়িতে লোকজন এলে শাশুড়িমাকে বলতে শুনি, সেই অতি মিথ্যা,শুষ্ক অথচ শ্রুতি মধুর সেই ভাষা, বড়বউমা আমাদের খুবই আদরের। আজ বড় ঘেন্না হয় এই শব্দে ।আমার বাপের বাড়ীর কোন সাপোর্ট নেই, তাই আজো এ বাড়ীর উপেক্ষা, কষ্ট, লাঞ্ছনা, অপমান হজম করে ও শুধু ‘বড়বউ’ হয়ে ওঠার চেষ্টা করেছি।
মনে বড় পীড়া দেয় , সেসব দিনের কথা ,বিয়ের পর থেকেই নন্দায়ের অফিসের ভাত,অসুস্থ শ্বশুরমশাইয়ের সেবাযত্ন,ননদের দুদুটো বাচ্চার সমান তালে পরিচর্যার দায়িত্ব, সেই পরিসরেই আমার নারী জন্মের সার্থকতার প্রথম স্বাদ অনুভব করি ।
বুঝতে পারি যে আমি মা হতে চলেছি, আনন্দে উৎকণ্ঠায় আমার সারা শরীর কাঁপতে থাকে ।ভাবলাম কয়েকটা দিন যাক তারপর ব্যাপারটা সবাইকে জানাবো।এ অবস্থায় নিরন্তর পরিশ্রম, না আমার শারীরিক ত্রুটির কারণে জানিনা, সে আর গর্ভে রইলো না ।
সেই চরম কষ্টের দিনেও,স্বামীর মুখঝামটা ,কাণ্ড জ্ঞাণহীন অপয়া বলে গালি খেতে হলো। শাশুড়িমা কিছুটা স্বন্ত্বনা দিলেন ঠিকই, তবে তার আচরণে মনে হলো না যে তিনি খুববেশি বিচলিত ও আশাহত হয়েছেন।শুধু বললেন যাক বউমা আবার পরের বারের জন্য আমাদের অপেক্ষা করতে হবে ।
তাছাড়া তোমার ননদ দেওয়রের ছেলেমেয়েকেও তো নাড়লে চাড়লে, তারা কি তোমার সন্তান নয়?
দিন গড়িয়ে রাত নামে, মাস যায় বছর যায় ।ধীরে ধীরে শারীরিক ও মানসিক ভাবে সুস্থ হয়ে উঠতে লাগলাম ।পরের বারের আশায় আমি ও পাথরে বুক বাঁধলাম।ছোট দেওর ও চাকরি পেয়েছেলে আর নিজের পচ্ছন্দের মেয়ে তন্দ্রাকে বিয়ে করল। বাড়ীতে আবার আনন্দ উৎসব হলো ।

সময় গেল নদীর স্রোতের মতো, তন্দ্রার কোল আলো করে এলো খোকনসোনা । আমি ও অনুভব করলাম শরীরে দ্বিতীয়র আগমনের চিহ্ন, ঈশ্বরকে মনে মনে কত মানত জানালাম। কিন্তু ঐ পাথরের মূর্তি কিছুই কানে নিল না। চির জন্মের মতো আমার মা হওয়ার সাধ ঘুচিয়ে সেই চলে গেল ।ডাক্তারবাবু বললেন যে আমার ইউটেরাসের ধারন ক্ষমতা কম,অধিক বয়স ও সাংসারিক শ্রম তাই একদম বেডরেস্টে থেকে, ব্যয় সাপেক্ষ চিকিৎসা করালে হয়তো—–নইলে নয়।

দিশেহারা হয়ে গেলাম, আচমকা চারপাশে যেন অন্ধকার নেমে এলো । পায়ের তলার মাটি সরে গেল । পৃথিবীটা যেন ভূ-আন্দোলন হঠাৎ আড়োলিত হতে লাগল। সারা শরীর যেন অসাড় হয়ে এলো। এমন করেই ক’ঘণ্টা অতিবাহিত হলো তার হিসেবে নেই ।
হঠাৎ এ বাড়ীর বড় খোকার চিৎকারে সম্বিত্ ফিরে পেলাম, তিনি মাকে বলছেন তোমারা সবাই মিলে এই, অপয়া মেয়েটার সঙ্গে বিয়ে দিয়ে আমার জীবনটা নষ্ট করে দিলে? বলে গজগজ করতে করতে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেলেন ।

একটি বারও সৌজন্যতার খাতিরেও আমার মুখ দর্শণের প্রবৃত্তি তার হলো না। চরম অপরাধীর মতো দুঃখে লজ্জায়, কাঠ হয়ে বিছানার এক কোনে পড়ে রইলাম। শুধু অসহায় দুটো চোখ নিরুপায় হয়ে অশ্রুজলে ভাসতে লাগল।
মনে হতে লাগল, এক্ষুনি যদি মাটি দুফাঁক হতো তো আমি সীতা মায়ের মতো, সব অভিমান, সব অভিশাপ,সব বাক্যবাণের জ্বালা, সবার শুষ্ক আদরের বিদ্রুপ ও আমার পোড়া ভাগ্যের ছাই নিয়ে চিরতরে মাটিতে মিশে যাই ।
আঁচল খুঁটে বাঁধা চাবির গোছাটাও বিদ্রুপ সহ্য করতে হতো না।
আর এই অর্থহীন জীবনের গ্লানি বয়ে, সবার হুকুম তালিম করে, শত অপমানেও মুখে কুলুপ দিয়ে বড়বউ সেজে ,এই পোড়া জীবন বইতে হতো না ।।

——————————————–

শ্রদ্ধাঞ্জলি
সীমা দাশশর্মা সামন্ত
26/5/2022
****************
বলা হয় তাঁকে ‘বিদ্রোহী কবি ‘
বরেণ্য কবি কাজী নজরুল ,
শুধু বিদ্রোহী কবি বলা হলে
হবে তা মস্ত ভুল |
রচিছেন তিনি বহু শ্যামা সঙ্গীত ,
ভক্তি রসে পূর্ণ সেই গীত |
পুত্রশোকে রচিছেন তিনি হায়
“শূন্য এ বুকে পাখি মোর আয় |”
করতে দেশমাতৃকাকে শৃঙ্খলমুক্ত
জওয়ানদের উদ্দেশ্যে রচিলেন গীত উক্ত
“কারার ঐ লৌহকপাট
ভেঙে ফেল কর রে লোপাট|”
ধর্মের ভেদাভেদে তাঁর কেঁদে উঠতো প্রাণ,
রচিলেন তিনি “মোরা এক বৃন্তে দুটি কুসুম
হিন্দু -মুসলমান |”
শিশুদের জন্যও তাঁর হৃদয় ছিল ভালোবাসায় ভরা ,
“খাঁদু দাদু “,” কাঠবেড়ালি “লিখলেন
এমন অনেক মজার ছড়া |
বিদ্রোহী কবিকে আমরা পাই “বিদ্রোহী” কবিতায় ,
“চির উন্নত শির “কবির কলম হঠাৎ থেমে গেলো হায় |
পক্ষাঘাতে হলেন তিনি ধরাশায়ী ,
নীরব হলেন কবি ,সৃষ্টি গেল থেমে ,
সাহিত্যের আঙিনায় বিষাদ এলো নেমে |
অবশেষে বাংলাদেশ ঢাকায়
কবির জীবনদীপ যায় নিভে |
কবি অন্নদাশঙ্করের ভাষায় —
“সব ভাগ হয়ে গেছে বিলকুল
ভাগ হয়নিকো শুধু নজরুল |”

——————————————–

” চিঠি ”
লিলি ইসলাম

প্রিয় মায়া,
উদাসী মেঘের লুকোচুরি দেখেও যেমন চাতক আশা হারায় না! যেমন পায় মাহেন্দ্রক্ষণে খোঁজে অনাথ বৃষ্টি- ঠিক তেমনি আশা নিয়ে, আমিও খুঁজি অপ্রার্থিব দু-চোখে বাঁধনহারা সেই তোমাকে। এক উজ্জ্বল অলৌকিক রশ্মি হয়ে এসে চলে গিয়েছো ফেলে, রৌদ্রময় দুপুরের আগ্রাসনের দুর্ভিক্ষ প্রেমের বেদনাতে। অরণ্যের স্নিগ্ধ সবুজ প্রেম হারিয়েছি স্নিগ্ধ নীলে। মায়া জানো? আজ আমি হেলার কঙ্কালের বীভৎস নেশায় মেতে রই। দিকপাল হীন উদ্বাস্ত প্রেমিক নাবিক আমি।জীর্ণ কোন লাশের পাশে বসে আমি হাসি প্রাণ খোলা হাসি। আমার হৃদয়-পৃথিবীর সমস্ত প্রেম অশ্রুর শিশিরে সিক্ত। তুমি ছাড়া আজ আমি শূন্য…গন্ধহীন গোলাপ। অসহনীয় দুঃখ লুকিয়ে সুন্দর হাসি দেওয়া ছাড়া কিছুই পারি না। বহুরূপী দুঃখ নিরসনে অসহায় মন তুমি নামের সান্তনা খুঁজি। “মায়া” ক্ষত-দুঃখগুলো আসলে খুবই মূল্যবান যা ভালোবাসাকে জাগিয়ে তুলে। তাইতো মৃত্যুমুখী ভালোবাসার শোকার্ত বিলাপে তোমায় খুঁজি। ভালোবেসে তোমায় নাম দিয়েছি “মায়া”। হঠাৎ যেদিন চলে গেলে কাউকে না জানিয়ে! অশ্রুসরোবরে বসে সেদিন খুব কেঁদেছিলাম। ঘরের কোনে ডালিম গাছের ডালে যে পাখিটি বসতো, আজ সাতদিন হলো পাখিটি আর আসছে না! মনে হয় চলে গিয়েছে সুদূরে কোথাও স্তব্ধতার অন্তরালে। তোমার দোলনচাঁপা গাছটিতে আজই প্রথম কলি থেকে ফুল ফুটেছে! যে ফুলের গন্ধ ছুটে আসে বাতায়ন ভেদ করে, আমার সুগন্ধি ঘুমের ঘ্রাণে। জানো মায়া! তোমার আবির মাখা গালে একবার যদি হাত বুলিয়ে,দিতে পারতাম! তবে স্বপ্ন বেহালার ছেঁড়া তারে ঝরে পড়তো সুরের বাণী। তোমার কাজল কালো মায়াবী চোখে চোখ রেখে, অপলক চেয়ে থাকতে পারতাম! তবে রামধনুর সাত রঙে তোমার মুখচ্ছবি আঁকতাম হৃদয়ে। তোমার কানে কানে একবারের জন্য হলেও বলতে পারতাম ভালোবাসি, তবে শুকনো মরু- হৃদয়জুড়ে নেমে আসতো ঝরনাধারা। এর পরে মৃত্যু আসলে, হাসিমুখে স্বাগত জানাতাম। মৃত্যুকে সুখের চাদর করে,সমাধির বুকে , জড়িয়ে রাখতাম।
মায়া!আজ তোমাকে বড্ড বেশি মনে পড়ছে! মনে আছে তোমার? বৈশাখের প্রথম দিনে বৃষ্টিতে আধো-ভিজে, দু’জন ফুসকা খেতে গিয়েছিলাম কলেজ ক্যান্টিনে। সবাই তাকিয়ে দেখছিল আমাদের দু’জন কে। তুমি লজ্জাতে কেমন লাল হয়ে গিয়েছিলে। একটা ফুসকাও তুমি খেতে পারোনি লজ্জায়। সবুজের মতো সরল মন তোমার, যেন পবিত্র মায়া তোমার সর্ব অঙ্গ জুড়ে। আজ তুমি হীনা নিঃসঙ্গ আমি! একাকিত্ব সঙ্গী করেছি, নির্জনতা আপন করে। প্রকৃতির সবুজ ঘাস বুকে জড়িয়ে রেখে বেঁচে থাকার চেষ্টা করছি প্রতিনিয়ত। মায়া! জানিনা তুমি কেমন আছো, কোথায় আছো, কিভাবে আছো? শূন্য বুকে একটায় ব্যাকুলতা, খুব জানতে ইচ্ছে করছে আজ! তুমি ভালো আছো তো? দেখার ইচ্ছেটাও অনেক। জানিনা আর দেখা হবে কিনা তোমার সঙ্গে, তবুও অপেক্ষার প্রহর গুনে গুনে দিন কাটাচ্ছি তিক্ত বাসনাতে। ফ্লুইডের আবরণে সুপ্ত ইচ্ছেগুলো, ডেকে রেখেছিলাম বহুকাল ধরে। হঠাৎ হৃদয়ে সমুদ্রের ঢেউ এসে জাগিয়ে দিল সুপ্ত ইচ্ছেগুলো! ঝর্না ধারার মতো অনবরত বুলেট-বৃষ্টি ঝরিয়ে দিচ্ছে বক্ষ পিঞ্জিরাতে। নিজেকে ও নিজের ইচ্ছেগুলোকে গুটিয়ে নিয়ে চলা হলোনা আমার। মায়া! কখনো যদি জানতে পারো আমি আর নেই তোমাদের শহরে,তোমাদের শহরের মায়া ত্যাগ করে চলে গিয়েছি শতসহস্র মাইল দূরে!যেখান থেকে কেউ আর ফিরে আসেনা কস্মিনকালে! তুমি কি আমায় মনে রাখবে? তুমি কি আমায় ভেবে লোনা জলে বুক ভাসাবে? নাকি একটি তাজা গোলাপ,কল্পনায় ভাসিয়ে দিবে আমার সমাধিতরে।

২৬.০৫.২০২২

——————————————–

error: Content is protected !!

Powered by themekiller.com