Breaking News
Home / Breaking News / দুই বাংলার বৃহত্তম নেটওয়ার্ক দৈনিক শব্দনগরের সেরা চার সাহিত্য

দুই বাংলার বৃহত্তম নেটওয়ার্ক দৈনিক শব্দনগরের সেরা চার সাহিত্য

উলঙ্গ শিশু’টা
সানোয়ার হোসেন

মা’গো বিছিয়ে দাও তোমার আঁচল খানি
একটু ঘুমোক উলঙ্গ শিশুটা।
সে তো পেলো না মায়ের আদর স্নেহ
জানালো না বাবার নাম টা।

কত ব্যথা তার বুকের মাঝে
বোঝে কি ফাগুনের পাখি?
সে ব্যথা বোঝে বৃষ্টির জল
ঝরে যখন তার দুটি আঁখি।

তুমি দুরে ঠেলে দিওনা মা
নাও গো টেনে তোমার আঁচলে।
আমায় দেওয়া আদর স্নেহ মমতা
ভাগ করো তার জীর্ণ জীবন মূলে।।

——————————————-

যাত্রাপথে বিড়ম্বনা
———————-
ফিরোজ আহমেদ সুজা
১/৩/২২

খুলনা স্টেশন থেকে রেলে চেপে বসে আছি আমরা দুজন, খুলনা গিয়েছিলাম বানিজ্যিক বন্দর শহরে যদি কাজে সন্ধানে। হঠাৎ কিছু ছেলে ছোকড়া একই ক্যাবিনে উঠল। আমরা দুজনই লম্বা পাঁচ ফুট দশ সাড়ে দশ ইঞ্চি,সুঠাম দেহ দেখে ছেলেগুলো কি যেন ভাবে বলাবলি করতে লাগলো। কিছুক্ষণ পর একজন ক্যাবিন হতে নেমে গিয়ে রেল পুলিশকে ডেকে নিয়ে এসে আমাদেরকে দেখিয়ে দিয়ে বলল এরা দুই জন ডাকাত। আমারা আশ্চর্য হয়ে ওদের দিকে তাকিয়ে, বললাম আমাদের কোথায় লিখা আছে ডাকাত, আর আমরা টিকেট করেই গাড়িতে উঠেছি, যাব বগুড়া আমাদেরকে তোমরা চেন না জান না ডাকাত বলে দিলে আর পুলিশ ডেকে নিয়ে এলে!

পুলিশ বললেন আপনারা টিকেট করেছেন ?

আমি বললাম হ্যাঁ।

যাবেন কোথায়?
বগুড়া।

খুলনা কেন এসেছেন?

বললাম, আমার চাচা,ওর ভাই এখানে সেল তেল কোম্পানির জেনারেল ম্যানেজার,তাঁর কাছে এসেছি যদি কাজের সন্ধান বা সেল কোম্পানিতে এজেন্সি পাওয়া যায় কিনা ! সে জন্যই এখান আসা, আর আমি ব্যাবসা করি, মুক্তিযোদ্ধা।

পুলিশ আমাদের কথা শোনার পর ছেলেগুলোকে বললে কি ঝামেলা কর তোমরা সম্মানি মানুষ উনারা তোমরা এই ক্যাবিনে না পোষালে আরও ক্যাবিন আছে সেখানে গিয়ে উঠো। উনারা বোনাফাইট প্যাসেঞ্জার তোমরা বিরোক্ত করলে, ধমকের সুরে বললেন যাও নৈলে তোমাদের বিরুদ্ধে ব্যাবস্থা নিতে হবে।

ছেলেগুলো চেপে গেল। বেশ কিছুদুর আসার পর পথিমধ্যে ওরা ক্ষমা চাইল আমাদের কাছে। বললে
আমাদের মানুষ চিনতে ভুল হয়ে গেছে।
কথপোকথন কিছু হলো, জানতে পারলাম ওরা ছাত্র রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের যাচ্ছে ভর্তি হবার জন্য।

আব্দুল পুর ওরা নেমে গেল, আমরা দুজন শান্তাহার পর্যন্ত নির্বিবাদে এসে নেমে পড়লাম।

——————————————-

শিরোনাম – মধুর বসন্ত
কলমে-স্বপন কুমার মান্না
তাং-০১/০৩/২০২২
******************

রঙ লেগেছে কৃষ্ণচূড়ার মনে
অহংকারে পা পড়ে না তার,
খুশির ছোঁয়া অশোক পলাশ বনে
ঈর্ষা বুকে রূপ দেখে কে কার!

উত্তরে বায় ঝরায় যতো পাতা
পর্ণমোচী ভাগ্যহারা গাছে,
দখিন হাওয়া সবুজ ঢাকে মাথা
কিশলয়ের গন্ধে হৃদয় নাচে।

দুষ্ট কোকিল মিষ্টি ভোরের বেলা
প্রেমের নেশা ধরায় প্রেমিক মনে,
ফুলের বুকে মৌমাছিদের খেলা
ভালোবাসার মায়াবী জাল বোনে।

পূর্ণ চাঁদের জ্যোৎস্না ভেজা রাতে
দুইটি হৃদয় থাকলে পাশাপাশি,
আবেগ মাখা কোমল চারি হাতে
আলিঙ্গনে লজ্জা মাখা হাসি।

গন্ধে মাতায় জুঁই চামেলি বেলি
সঙ্গী করে হরেক পাখির গান,
বলছে ডেকে আয়রে কোথায় গেলি
নে না লুটে বসন্তের এই দান।

——————————————–

#গল্প
#অ্যালঝাইমার (পিতৃ তর্পণ)
#সুস্মিতা

(2009 সালে লেখা এই গল্পটি পূর্ব প্রকাশিত এবং আমি বহুবার পোস্ট করি। এই লেখা আমি বারবার পোস্ট করব…যতদিন পর্যন্ত না “অ্যালঝাইমার”অসুখটকে হারিয়ে দেওয়ার পথ চিকিৎসাবিজ্ঞান খুঁজে বের করবে।
গল্পটির সাহিত্যমূল্য বিচার করবেননা। পড়ামাত্র share করুন। নিজে সচেতন হোন , আরও অনেককে সচেতন করুন। “অ্যালঝাইমার” মহামারীর রূপ নিচ্ছে সারা পৃথিবীতে।
গল্পটি হাজার হাজারবার share করা হয়েছে । যারা আগে পড়েছেন, share করেছেন তাঁরা আবার করুন। যাঁরা প্রথম পড়ছেন…সাহায্য চাইছি…

এই গল্পটি হোক প্রকৃত পিতৃতর্পণ

এই গল্পটি লেখার আগে আমি পৃথিবীর সমস্ত অ্যালঝাইমার রোগগ্রস্ত পিতার কাছে ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি এবং প্রার্থনা করি -কোনও কন্যাসন্তানকে যেন আর কোনোদিন এরকম গল্প লিখতে না হয় …)

#অ্যালঝাইমার

#সুস্মিতা

নিজের জীবনের গল্প লিখতে গেলে,নিজেকে একটু দূর থেকে দেখতে হয়…অন্যের চোখ দিয়ে…।

ছোটবেলা থেকেই আমাদের বাড়ির পরিবেশ আমার অন্যান্য বন্ধুদের বাড়ি থেকে কেমন যেন একটু আলাদা ছিল। তখন সঠিক কিছু বুঝতামনা কিন্তু অন্য বন্ধুদের বাড়ি গিয়ে যখন দেখতাম…ওদের বাবারা দশটা-পাঁচটা অফিসে যান, বাজার করেন,খুব ঘরোয়া সংসারী মানুষের মতো কথা বলেন…আমার বাবা তখন আমাকে ‘বিপ্লব’এর গল্প বলতেন, অক্টোবর রেভিলিউশনের কথা বলতেন…বলতেন-“পৃথিবীর সব মানুষ সমান,তাদের সমান অধিকারের কথা”। কি উদাত্ত কণ্ঠে বাবা গণসঙ্গীত…পল রোবসনের গান গাইতেন।
বাবা কলেজের অধ্যাপক ছিলেন। বাড়িতে যখন ছাত্ররা কিম্বা অন্যান্য মাস্টারমশাইরা আসতেন,বাড়ির পরিবেশটাই কেমন যেন বদলে যেত…সবাই কি এক “ক্লাসলেস সোসাইটির” স্বপ্নে বিভোর…
স্কুলের অনেক বন্ধুদের বাড়িতে দেখতাম পুরুতমশাই ডেকে কতরকম পূজো পার্বণ হত। আমাদের বাড়িতে সেসব কখনও দেখিনি…অথচ বাড়ির পরিবেশটা যেন তার থেকেও বেশি পবিত্র মনে হত…।
পাশের বাড়ির দিদা একদিন তাদের জমাদারটিকে বড্ড বকাবকি করছিলেন-কিছু একটা ছুঁয়ে ফেলার জন্য।অথচ আমার বাবাকে দেখেছি তাকে নিজের হাতে চায়ের কাপ তুলে দিতে। বাবাকে নিয়ে আমার বড্ড গর্ব হত। মনে মনে ভাবতাম- “আমার বাবা সকলের থেকে আলাদা…কি ভীষণ জ্ঞানী, শান্ত, সৌম্য”। বাবা ছিলেন আমার জীবনের ধ্রুবতারা…আদর্শ মানুষ।
কলেজে যাওয়ার পরে এক বান্ধবী একসময়ে আমাকে বলেছিল- “তোকে আর মেসোমশাইকে দেখলে কাইফী আজমী আর শাবানা আজমীর কথা মনে হয়”। শুনে আমার সে কি আনন্দ…।

কলেজ জীবন শেষ হতে না হতেই আমার বিয়ে হয়ে গেল। আমার স্বামী বাবারই ছাত্র।
ধীরে ধীরে আমরা সবাই নিজস্ব কাজ ও লেখাপড়ার জগতে ব্যস্ত হয়ে গেলাম। কয়েক বছরের মধ্যে আমার জীবনে এসে গেল আমার একমাত্র সন্তান…আমার মেয়ে।

আমাদের বিয়ের বারো বছর পরে আমার মায়ের মৃত্যু হয়। মা ছিলেন বাবার ছায়াসঙ্গিনী…ভারি ডিগনিফায়েড্।
মা চলে যাওয়ার পর থেকেই বাবা খুব অস্বাভাবিক রকমের শান্ত আর চুপচাপ হয়ে গিয়েছিলেন। আমরা সেটাকে শোকের বহিঃপ্রকাশ বলেই ধরে নিয়েছিলাম। একটা চেয়ারে বসে পশ্চিমের জানালা দিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে বাবা ঘন্টার পর ঘন্টা বসে থাকতেন…
আমরা বিরক্ত করতামনা, ভাবতাম হয়ত পুরোনো স্মৃতিতে ডুবে আছেন। আমরা ভুল করেছিলাম, বুঝতেই পারিনি ‘স্মৃতিচারণ’ নয়…বাবার মন থেকে ধীরে ধীরে অনেক স্মৃতি হারিয়ে যাচ্ছে…
‘অ্যালঝাইমার’ নামটাও তখন এত পরিচিত ছিলনা। চিকিৎসা শুরু করতেই অনেক দেরি হয়ে গিয়েছিল…

আগে বাবা থাকতেন শুধু কলেজের ছাত্রছাত্রীদের পড়ানো নিয়ে। তার বাইরে প্রাইভেট ট্যুইশন বা অন্য কোনও রোজগারের কথা তিনি কখনও ভাবেননি। এন.জি.ও.তে চাকরি করে আমার যা আয়,সেটা খুব সাধারণ একটা জীবন কাটানোর জন্যই যথেষ্ট।আমার স্বামী মূলতঃ রাজনীতির সাথেই যুক্ত, বাড়িতেও কিছু ছাত্রছাত্রী পড়ান তবে সেটা তার সমাজসেবামূলক কাজেরই অন্তর্গত ।
এসব ছাড়াও সাধারণ মধ্যবিত্ত বা নিম্নবিত্ত মানুষের জীবনে ‘অ্যালঝাইমার’রোগটা তখন এত নতুন,এত অপরিচিত যে ঠিক কোন্ পথে কোন্ চিকিৎসকের কাছে চিকিৎসা করাতে হয়-সেগুলোই আমাদের জানা ছিলনা।
এসব কিছুর একটাই ফলাফল হল- “দেরি…অনেকটা দেরি” …

বাবার মনটার সঙ্গে সঙ্গে শরীরটাও যেন ক্রমশঃ পৃথিবীর সবকিছুর প্রতি ইন্টারেস্ট হারিয়ে ফেলছিল…। তখন আর চেয়ার নয়, বাবা আর বিছানা থেকে উঠতেই চাইতেননা। ক্রমশ অবস্থা এমন হতে থাকল যে প্রাকৃতিক কাজকর্মগুলোও বাবা বিছানায় করে ফেলতেন।
আমার স্বামী সন্দীপ খুব সহানুভূতিশীল মনের মানুষ। পরম মমতায় ও ওর প্রাক্তন মাস্টারমশাই কিম্বা বর্তমান শ্বশুরমশাইয়ের যত্ন করত…
আমি দেখতাম আর ভাবতাম-“আমি কেন এমন করে আমার বাবার সেবা করতে পারি না?” গভীর রাতের অন্ধকারে যখন একলা শুয়ে কাঁদতাম, তখন আমি আমার এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পেয়েছিলাম…আমি আসলে আমার বাবাকে একজন অসুস্থ রোগী হিসেবে অ্যাকসেপ্টই করতে পারিনি।
যতক্ষণ মাথার ওপরে বাবা থাকেন ততদিন পৃথিবীর সমস্ত নারীর মধ্যে লুকিয়ে থাকে একটা ‘ছোট্ট বাচ্চা মেয়ে’। সে শুধু জানে- ঠিক ঈশ্বরের মতোই তার পিতা তার জীবনের পরম আরাধ্য পুরুষ। তাঁর তো কখনও কিছু হতে পারে না…তাঁর কেন অসুখ হবে ? পিতার কোনও বৈকল্য বাচ্চা মেয়েটা মানতেই পারেনা।ঠিক আধুনিক বিজ্ঞাপনের ভাষায় যেমন বলে-“মাই পাপা ইজ দ্য গ্রেটেস্ট”…

প্রথম বড় ধাক্কাটা এল একদিন সন্ধ্যাবেলা…অফিস থেকে ফেরার পরে…ব্যাগটা রেখে, বাবার ঘরে ঢুকে সামনে গিয়ে বাবার হাতটা ধরলাম…। বাবা হঠাৎ হাত ছাড়িয়ে নিজের দুহাত তুলে নমস্কারের ভঙ্গীতে বলে উঠলো- “নমস্কার দিদি, ভালো আছেন?” ভীষণ অবাক হতে হতেও ভাবলাম- ‘বাবার পুরোনো রসবোধ ফিরে এল নাকি?’ কারণ লক্ষ্য করছিলাম, গত কয়েকদিন ধরে বাবা অনেক পুরোনো অতীতের কিছু কথা বলেন…অথচ বর্তমান বা নিকট অতীতটা যেন বাবার স্মৃতিকোষ থেকে একেবারে মুছে যাচ্ছে। খুব ছোটবেলায়, খেলাচ্ছলে বাবাকে যখন আমি শাসন করতাম,তখন বাবা আমাকে ‘পিসিমা’বলে ডাকতেন…
কিন্তু না…বাবা আসলে আমাকে আর চিনতেই পারছেনা…জীবনের এই দিনটাকে মেনে নেওয়া ছিল আমার পক্ষে সব থেকে কঠিন। আমি কার উপরে জানিনা…রাগে, দুঃখে, ক্ষোভে পাগলের মত হয়ে যাচ্ছিলাম। মনে হচ্ছিল বাবাকে ঝাঁকুনি দিয়ে জাগিয়ে তুলি…এবং কি আশ্চর্য, সেই অবস্থাতেও অবুঝের মত বাবার প্রতি আমার প্রচন্ড অভিমান হল। মনে মনে বললাম- “বাবা, তোমার পৃথিবীতে তাহলে আমার আর কোনও অস্তিত্বই রইলনা? তুমি আমাকে একেবারে ভুলে গেলে?” বাবাকে ভীষণ জোরে জোরে ধাক্কা দিতে থাকলাম।

পরে খুব কেঁদেছি আর বলেছি- “বাবা তুমি আমাকে ক্ষমা করো…নির্মম অ্যালঝাইমার অসুখের কাছে তুমি যে কত অসহায়, আমার মন যে সেকথা মানতেই চায়না।” আমার বাবা, যিনি আমার কাছে চিরউন্নত শির, একটা অসুখের কাছে তিনি আজ এমনভাবে আত্মসমর্পণ করবেন কেন?

মানুষ কেন এত অসহায়? তখনও বুঝিনি ভবিষ্যৎ আমার জন্য আরও অনেক কঠিন দিন নিয়ে অপেক্ষা করে আছে…।
বাবাকে আজকাল সবসময় ডায়পার পরিয়ে রাখতে হয়। ঠিক ছোট বাচ্চারা যেরকম করে- ডায়পার পরা ও খুলে ফেলা নিয়ে বাবার বায়নাগুলো ঠিক সেরকমই। সেসব কিছু সন্দীপই সামলায়।
চিকিৎসা, আমার মেয়ের পড়াশোনা ও অন্যান্য স্বাভাবিক কারণেও সংসারে অর্থনৈতিক চাপ আজকাল বেশ প্রকট হয়ে উঠেছে। অফিসে কাজের চাপও খুব বেশি। তবুও তারই মাঝে আমার বাবার মস্তিষ্ক থেকে স্মৃতি যত মুছে যাচ্ছে…আমার স্মৃতিচারণ যেন ততই বেড়ে যাচ্ছে। রাতে ঘুম আসেনা, মনেমনে মায়ের ওপরেও কত অভিমান করি,খুব ক্লিশে হয়ে যাওয়া অভিযোগ করি- “আমাদের সবাইকে অসহায় ফেলে রেখে তুমি কেন এমন করে চলে গেলে মা ?”…

“অসহায়”? নারীর অনুপস্থিতি একজন পুরুষকে কতটা অসহায় করে তুলতে পারে তার শিক্ষা হল জীবনের কঠিনতম অভিজ্ঞতা থেকে …সম্পর্কের এই রূপও দেখা বাকি ছিল ….

সেদিন রাতেও ঘুম আসছিলনা। সন্দীপ আজকাল ট্যুইশনের পরিমান অনেকটা বাড়িয়েছে, তাই রাতটা অঘোরে ঘুমায়। পাশের ঘরে আমার মেয়ে,সামনেই হায়ার সেকেন্ডারি পরীক্ষা…সারাদিন পড়াশোনা করে ও ক্লান্ত।
হঠাৎ বাবার ঘর থেকে একটা অদ্ভুত আওয়াজ শুনে উঠে যাই। গিয়ে দেখি বাবা হাত দিয়ে টেনে হিঁচড়ে নিজের ডায়পারটা ছিঁড়ে ফেলেছে…শরীরে যেন অনেক শক্তি…চোখে অদ্ভুত একটা জান্তব দৃষ্টি…মুখ দিয়ে লালা গড়াচ্ছে…বাবা প্রবলভাবে মাস্টরবেট করছে…
আমি ভয় পাব? রাগ করব? চিৎকার করব?দুঃখ পাব? সন্দীপকে ডাকব নাকি ঘর থেকে চলে যাব?…এখন কি করব ?এরপরে কি করব?…
আমি অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে দাঁড়িয়ে থাকলাম।বাবা শান্ত হলে ধীরেধীরে বাবার কাছে গেলাম… তখন আমার ভয় করছিল…আমি একটাও কথা বলিনি, শুধু আসতে আসতে বাবাকে একটা নূতন ডায়পার পরিয়ে দিলাম…

বাবাকে আমি কখনও “অসুস্থ রোগী”হিসেবে অ্যাকসেপ্ট করতে পারিনি। আজ কেন জানিনা “বাবা”বলে একবার ডাকতেও পারলামনা…কি যেন একটা হারিয়ে গেল …।আমি বাবাকে ভয় পেতে শুরু করলাম…

নিজের ঘরে ফিরে আমি একেবারে চুপ হয়ে গেলাম। সন্দীপকেও কিছু বলতে পারলামনা…ভীষণ লজ্জা করছিল…এ যে আমার বাবার কথা।
পরদিন সকালে যন্ত্রের মত অফিসে গেলাম।কলিগ ও বান্ধবীদের সঙ্গে প্রায় সবকিছুই শেয়ার করা যায়। এটাই এযুগের মেয়েদের মুক্তির আকাশ।কিন্তু না, কিছুতেই বলতে পারলামনা। শ্বশুরবাড়ির কথা,স্বামীর সাথে মনোমালিন্য, সন্তানের বড় হওয়ার পথের নানা সমস্যা…সব আলোচনা করা যায়, কিন্তু এ কথা আমি কিভাবে বলব ?

দুশ্চিন্তা আর মনখারাপের টানাপোড়েনে ছিঁড়ে যেতে যেতে হঠাৎ শিরদাঁড়া বেয়ে একটা শীতল ভয়ের স্রোত টের পেলাম…”আমার মেয়ে বাড়িতে একা রয়েছে”। একই সাথে লজ্জায় কুঁকড়ে গিয়ে ভাবলাম…গতকাল পর্যন্ত “অন্তত বাবা বাড়িতে আছেন”-ভেবে আমি মেয়ের জন্য নিশ্চিন্ত বোধ করেছি …আজ আমি এ কি ভাবছি ? মানসিক যন্ত্রণার আগুনে আমি পুড়তে থাকলাম ….

এভাবে প্রায় দিন সাতেক কাটল। শেষপর্যন্ত এক বান্ধবীর সাহায্যে বাড়িতে একজন মাঝবয়সী মহিলাকে সারা দিনরাতের কাজের জন্য রাখলাম। খানিকটা বাড়তি আর্থিক চাপ হল ঠিকই তবুও সবদিক থেকে এরকম একটা ব্যবস্থাই সঠিক মনে হ’ল ।কাজের মাসীটিও বেশ হাসিখুশি ও দয়াবতী মহিলা …

এরপরে পনেরো দিনও কাটেনি।সহৃদয়া, স্বল্পভাষিণী মহিলাটি একদিন সকালে এসে আমাকে মৃদুস্বরে জানালেন- “দিদি,আপনি মেসোমশাইয়ের এর জন্য একটা ছেলে কাজের লোক ঠিক করে নিন…আমি আর এই কাজটা করতে পারবনা।”…
আমার বুঝতে কোনো অসুবিধা হ’ল না। আমি ওর কথা মেনে নিলাম এবং ওর প্রতি কৃতজ্ঞও বোধ করলাম ওর ‘সংবেদনশীলতার’ জন্য। ও তো চেঁচামেচি করেনি,কারুকে কিছু বুঝতেও দেয়নি।এক সহমর্মিতার বন্ধনে সেদিন সরলাকে আমি আমার বোন মানলাম।

আমার মেয়ে বাড়িতে একা থাকে আর মাত্র একমাস পরেই ওর উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা -এইসব কারণে বাড়িতে কোনো ছেলে কাজের লোক রাখা হয়নি। সন্দীপই যতটা পারে মেয়ের পড়াশোনা আর বাড়িটা সামলায়…ঠিকে কাজের মাসীর সাহায্য নিয়ে…।
শুধু রাতগুলো আমার বড় আতঙ্কে কাটে…কারণ এর মধ্যে আরও পাঁচ/ছয়বার আমাকে বাবার ওই একই ঘটনা সামাল দিতে হয়েছে। সেই সময়টায় আমার কোন “সত্তা”টা ঠিক কাজ করেআমি জানি না…
একদিকে বাবার প্রতি কিম্বা সমগ্র পুরুষ জাতির প্রতি রাগে,ঘৃণায়,দুঃখে আমার ভিতরটা জ্বলে পুড়ে যায়…। ভাবি,পুরুষ কত বয়স পর্যন্ত এমন ইন্দ্রিয়ের দাস হয়ে থাকে? অন্যদিকে আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে ভাবি- “আমার স্বামী বা আমার মেয়ের সামনে যেন এই ঘটনা না ঘটে…তখন যেন মা হয়ে আমি শিশুসন্তানের মতো আমার বাবাকে আগলাই।অন্য কেউ যেন আমার বাবাকে ভুল না বোঝে।”
এ যে কি নিদারুণ যন্ত্রণা…। আর্থিক চাপ,শারীরিক ও মানসিক কষ্টের বোঝায় আমি ভেতরে ভেতরে ক্ষয়ে যেতে থাকি। আমার ধৈর্যচ্যুতি ঘটতে থাকে।আজ স্বীকার করতে লজ্জা নেই… বাবার প্রতি, বাবার অসুস্থতার প্রতি আমি বিরক্ত বোধ করতে শুরু করি। এন.জি.ও. তে বহুদিন ধরে ‘সম্পর্ক’নিয়ে কাজ করার ফলে এটা জানি যে- দীর্ঘদিন অসুস্থ রোগীর সেবার কাজ করতে করতে সাধারণ মানুষ ক্লান্ত হয়ে পরে।রোগীর প্রতি দয়া,মায়া,ধৈর্য সবই কমে যায় …
“বাবা,তোমার এই মেয়ে বড় সাধারণ, আমাকে ক্ষমা করো…আমি অসাধারণ হয়ে উঠতে পারিনি…বাবা”…

সেদিন সন্দীপ গিয়েছে আসানসোলে।বন্ধুর ভাইয়ের বিয়েতে,ওখানেই থেকে যাবে। রাত তখন তিনটে সাড়ে তিনটে বাজে…।বাবার ঘর থেকে সেই গোঁ গোঁ শব্দটা ভেসে এল।….”আমার মেয়ে জেগে যাবে” এই ভয়ে আমি ছুটে গেলাম বাবার কাছে…
বাবার দৃষ্টি তখন জান্তব…হঠাৎ বাবা নিজের ডায়পার ছেড়ে আমার গায়ে হাত বোলাতে শুরু করে…হাত চলে আসে আমার বুকের কাছে …টেনে ছিঁড়ে ফেলতে চায় আমার ম্যাক্সি। দৃষ্টি ক্রমশ লোলুপ…
আমি সবথেকে বেশি আহত হই আমার বাবার মুখের অশ্রাব্য,অশালীন যৌনগন্ধমাখা ভাষা শুনে…এই আমার শান্ত,সৌম্য,শিক্ষিত বাবা?আমার ঈশ্বর?
আমার আর কোনও হিতাহিত জ্ঞান রইলনা…আমি শরীরের সমস্ত শক্তি সঞ্চয় করে বাবার হাতদুটো মুচড়ে দিয়ে সপাটে বাবার গালে একটি…।
বাবা এঁকেবেঁকে নীচু বিছানা থেকে পড়ে যায়…আমার যেন তাতেও শান্তি হলনা…হাতের কাছে ছিল মেয়ের কাঠের রুলার…আমি সেটা তুলে নিয়ে বাবাকে এলোপাথারি মারতে শুরু করি আর চিৎকার করে কাঁদতে থাকি…

আমার সম্বিত ফিরে আসে বোধহয় মিনিট পনেরো পরে…তখন আমি মেয়ের কোলে মাথা রেখে মাটিতে শুয়ে আছি।পাশেই মাটিতে শুয়ে আমার বাবা…ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে…দৃষ্টিতে কোনও বোধই নেই …

এর সাতদিন পরের ঘটনা। মেয়েটা আমার অনেক বড় হয়ে গিয়েছে…কখন যেন হয়ে গিয়েছে আমার “মা”।সন্দীপকে সব খুলে বলা, আমার এন.জি.ও.র বান্ধবীদের সঙ্গে কথা বলে অ্যালঝাইমার রোগগ্রস্ত বৃদ্ধবৃদ্ধাদের থাকার জন্য বৃদ্ধাবাসের ব্যবস্থা- সব আমার মেয়ে সুচেতনাই করেছে।

বাবাকে সেখানে রেখে এসেছি। আমাদের বাড়ির মতোই খুব সাধারণ ব্যবস্থা। খুব দামী কিছু তো সম্ভব নয়। মাঝেমাঝে কয়েকটা দিন হয়ত কিছু অনাদর, কিছু অযত্নও পাবে…যেমন আমাদের মতো সাধারণ ঘরেও সবাই পায়। আবার কয়েকটা দিন হয়ত ভালোবাসার আলোয় উজ্জ্বলও হবে…হয়ত…
আমি সপ্তাহে তিনদিন অফিস-ফেরত আর রবিবার বাবাকে দেখতে যাই। প্রতিদিনই আমাকে দেখে বাবা দুহাত তুলে নমস্কার করে বলেন-

“নমস্কার দিদিমনি, ভালো আছেন তো?”

**************

কয়েকটি কথা

বন্ধুরা, এতজন জানতে চেয়েছেন অ্যালঝাইমারের কাজ বিষয়ে । অনেকেই সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতে চেয়েছেন, এই কাজে যুক্ত হতে চেয়েছেন …আমি কতটা আপ্লুত ও কৃতজ্ঞ বোধ করছি,তা লিখে বোঝানোর মতো ভাষা আমার জানা নেই।

আজকের পৃথিবীর সবথেকে বড় অসুখ হলো একাকীত্ব ও নিঃসঙ্গতা। মানুষ ক্রমশ বড় একা হয়ে যাচ্ছে ।কিন্তু সুস্থ থাকতে হলে মানুষের পাশে মানুষকে দাঁড়াতেই হবে ।

অ্যালঝাইমার অসুখটি বর্তমানে সারা পৃথিবীতে মহামারীর রূপ নিতে চলেছে। ঠিক সময়ে সচেতন না হলে বড় নিদারুণ পরিণতি হতে পারে এই অসুখের ।

রোগটি সম্পর্কে আমরা বোধ হয় খুব কম জানি ।এই বিষয়ে মানুষকে সচেতন করাই আমাদের উদ্দেশ্য। আমরা সেই কাজই করি।

এই কাজকে আরও এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য আপনাদের সকলের সাহায্য চাই ।কিভাবে সেটা সম্ভব, আপনারা মতামত জানান…

“অ্যালঝাইমার”গল্পটিকে শেয়ার করুন বা কপি করে নিজেদের ওয়ালে পোস্ট করতে পারেন ।

আমেরিকা থেকে প্রকাশিত দুকূল পত্রিকা গল্পটিকে বিদেশের পাঠকের কাছে ছড়িয়ে দিতে সাহায্য করেছেন।আমি তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাই ।

Dignity Foundation,কলকাতার এন.জি.ও স্বয়ম এবং বহু বৃদ্ধাবাস গল্পটির মাধ্যমে সচেতনতা প্রসারে পাশে দাঁড়িয়েছেন ,তাদের সকলকে জানাই কৃতজ্ঞতা

সম্পূর্ণ বাস্তব অভিজ্ঞতার ওপরে ভিত্তি করে লেখা এই গল্পটির দয়া করে কোনও সাহিত্যমূল্য বিচার করবেননা ।

শ্রদ্ধা জানিয়ে চরিত্রদের প্রকৃত পরিচয় দেওয়া হলনা ।

——————————————-

error: Content is protected !!

Powered by themekiller.com