Home / Breaking News / কবি রিটন মোস্তফা রিটন এর ■ ইতি আপার কাউন্টার রিপ্লে ■

কবি রিটন মোস্তফা রিটন এর ■ ইতি আপার কাউন্টার রিপ্লে ■

■ ইতি আপার কাউন্টার রিপ্লে ■
– রিটন মোস্তফা

যে কারণেই হোক জীবনটাকে ঐপর্যায়ে টেনে তুলতে কখনোই পারিনি। যেখানে দাঁড়িয়ে সন্তষ্টির নিঃশ্বাস ফেলার সুখ পাওয়া যায়। তাই অপূর্ণতা নামক শব্দটি এখন আমার জীবনের বড় প্রাপ্তি। অভাবের মধ্যেই ইদানিং নিজের ভালোলাগাটুকু খোঁজার চেষ্টা করি। কিছু মহৎপ্রাণ মানুষ আমার এই টেনে হিঁচড়ে চলাটাকে প্রশংসার মাধ্যমে উৎসাহিত করে। এই মানুষগুলোর মন-টা এত বড় কেন হয় তার কারণ আমি খুঁজে পাইনি।

বছর খানেক আগে এই টানাটানির মধ্যেও ইচ্ছে হলো মোটরবাইক চালাবার। অনেক কষ্টে একটা ‘ঠরমড়া’ মটর বাইক তখন কিনেছিলাম। কিনেও এক বিপদ। প্রতিদিনই “মেকারি” না করলে এটা চালানো মুশকিল। তবুও শখের জিনিস বলে কথা। প্রতিদিনই মেরামত করি আর চালাই। এ ব্যাপারেও কিছু উদার মনের মানুষের উৎসাহ আর প্রশংসার কমতি নেই। “দারুণ বাইক কিনেছ, খুব সুন্দর মডেল। তোমাকে দারুণ লাগে বাইকটাতে…..ইত্যাদি।
এধরণের মানুষগুলোর জন্ম বোধয় ঈশ্বরের প্রচণ্ড ভালোবাসাতেই হয়। এরা অন্যের খারাপ এবং দূর্বল দিক কখনওই দেখতে পান না।

মোটরবাইকটার প্রথম পিকআপে কালো ধোঁয়া এবং ভটভট আওয়াজ হয়। এজন্য স্টার্ট-টা সাধারণত বাড়ির ভিতরের উঠোনেই দেই। এরপর শব্দ আর কালি কমে গেলে তারপর রাস্তায় বের করে শরীরে হাওয়া লাগাই আর বাইক চালাই। এটা প্রতিদিনের ঘটনা।

দুপুরে একটা কাজে বাড়িতে এসেছিলাম। মোটরবাইক বাহিরে রেখেই কাজ সেরে যখন আবার বাজারে যাব তখন এটার স্টার্ট বাধ্য হয়ে বাহিরেই দিতে হলো আজ।

দেখতে পেলাম ‘ইতি’ আপা, যে কি’না আমার বাড়ির রাস্তার ওপারের বাড়িতেই থাকেন, সে এদিকেই এগিয়ে আসছে। কাছে এসে থামলেন তিনি। মুখটা বাঁকা করে রাগ রাগ ভাব করে বললেনঃ
‘ছিঃ কি বিকট শব্দ আপনার বাইকে, তার সাথে বিশ্রী ধোঁয়া লক্ষ্য করেছেন? এটা চালাতে আপনার খারাপ লাগে না?”

ওনাকে আমি আগে থেকেই চিনি। যদিও জানি ‘ইতি’ আপা একটু অহংকারী, তবুও ওনাকে আমি খুব পছন্দ করি। বড় বোনের মতো মনে হয়। তাকে দেখলেই বড় বোনের কথা মনে পড়ে যায়।

‘ কি করবো আপা, চেষ্টা তো প্রতিদিনই করি যেন এই সমস্যাগুলো না হয়। কিন্তু পেরে উঠছি না। ঠিক আছে আপা এখন থেকে আরও বেশি চেষ্টা করবো। ওকে?’

ইতি আপা ওভাবে মুখ বাঁকা করেই বাড়ির দিকে চলে গেলেন। বাড়ির বারান্দায় তার নিজেরও একটা স্কুটি বাইক আছে…….।।

তিন চারদিন পর বাড়ি থেকে বের হয়ে বাজারের দিকে যাচ্ছি, চোখ পড়ল ইতি আপার বাড়ির বারান্দায় খেলতে থাকা তার ছোট্ট বাচ্চাটির দিকে, বাড়ির কাজের আরেকটি ছোট্য মেয়ের সাথে খেলছে সে। এই সময় ইতি আপা হাতের আঙুলে মোটরবাইকের চাবি ঘুড়াতে ঘুড়াতে ঘর থেকে বের হয়ে এলেন। নিজের বাচ্চাটির দিকে তাকিয়ে আদর মাখা গলায় বললেন ” এই সুন্দর টূকটুকে মেয়েটা কার রে…..? ” বাচ্চাটাও আদরে গলায় বললো ” তোমার ….. আম্মু”

ইতি আপা এবার আঙুলে ঘোরানোর চাবিটা দিয়ে মোটরবাইক অন করে স্টার্ট দিতে গেলেন, এবার যাবি কোথায়,,,,, ওমনি ভট্ভট্ শব্দে একগাদা কালো ধোঁয়া গিয়ে বাচ্চাটার মুখে লাগল। আতঙ্কে ও যন্ত্রণায় চিৎকার করে উঠল ছোট্ট বাচ্চাটা। এই অবস্থা দেখে আমি এক লাফে গিয়ে বাচ্চাটাকে কোলে তুলে নিলাম। পকেট থেকে রুমাল বের করে খুব দ্রুত বাচ্চাটার মুখ থেকে কালি সরাবার জন্য মরিয়া হয়ে গেলাম। অথচ স্বর্ণালি আপা মোটরবাইকের উপরেরই বসে আছেন, যদিও মুখে হতভম্ব একটা ভাব। অবাক হলাম আমি। সে তার বাচ্চাটাকে রক্ষা করার পরিবর্তে নিজের অহংকার রক্ষা করতে মরিয়া হয়ে উঠলেন যেন-

” ভাই আমার মোটরবাইক কখনও এমন করে না। আজ কি যে হল বুঝতে পারছি না। শব্দ বা কালো ধোঁয়া বের হবার কথা না কখনও, এত ভালো বাইকটা আমার।”

রাগ হলো আমার। আমি এগিয়ে গেলাম তার কাছে।

“আপা এই দেখেন আপনার মোটরবাইকের সাইলেন্সার আগে থেকেই ফাটা। বহুবার পিতল ঝালাই করার পরেও আবার ফেটেছে। আর এটা আমি আগে থেকেই জানি। কারণ আপনি যেখানে বাইকটা মিরামত করতে দেন, সেখানে আমিও আমারটাও দেই। গত ক’দিন আগে আপনি যখন আমাকে আমার মোটরবাইকের ভটভট শব্দ আর কালির কথা বলছিলেন, তখন আমিও আপনাকে আপনার মোটরবাইকের দুর্দশার কথাটা বলতে পারতাম। কিন্ত বলতে পারিনি। কারণ আমি আপনাকে আমার বড় বোনের মতোই দেখি, শ্রদ্ধা করি, ভালোবাসি। আর এ কারণেই সাহস হয়নি। এই নিন বাবুটাকে ভালো করে মুখটা পরিষ্কার করে দিন আগে। ওর চোখ জ্বলছে আপনার স্কুটির ধোঁয়া লেগে।”

ক’দিন পর____ হঠাৎ আমার একটা মিষ্টি পান খাবার খুব ইচ্ছে হল। বিছানার এদিক-ওদিক ঝেরে পান কেনার টাকা সংগ্রহ করলাম। হাত একদম ফাঁকা যাচ্ছে কিন্তু শখ কমছে না। বাড়ির সামনের রাস্তার ধারের পানের দোকানে বসে একটা মিষ্টি পান কিনে আরামসে চিবুতে শুরু করেছি এমন সময় দেখি ইতি আপা তার বাড়ির সামনে রাস্তায় দাঁড়িয়ে চোখের চশমা একবার খুলছে, টিস্যু দিয়ে মুছে আবার চোখে দিচ্ছে। বারবার সে এটাই করছে। বুঝলাম চশমাটা পরিষ্কার হচ্ছে না অথবা চোখে সে পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছে না। তার এমন কষ্ট দেখে রাস্তা পার হয়ে এগিয়ে গেলাম তার কাছে। আমাকে দেখে বোধহয় সে বিরক্ত হলো। বুঝতে পেরেও গায়ে নিলাম না।

“আপা চশমা বারবার মুছে কি করবেন। আপনি যে চোখে কাজল দেন সেটা বোধহয় বে’লাইনে আজ দিয়ে ফেলেছেন। এজন্য দেখতেও যেমন বীভৎস লাগছে, তেমনই ওটা লেপটে গিয়ে আপনার চোখের দৃষ্টিকেও ঝাপশা করছে। চশমা বাদ দিয়ে চোখটা মুছুন। আশাকরি আর সমস্যা হবে না।”

পরামর্শ দিয়ে উল্টো রাস্তা ধরলাম। বুঝতে পারছি ইতি আপার ক্ষিপ্ত দুটি চোখ আমার পিঠের উপর পড়ে আছে। পানের দোকানদারকে পানের টাকা দেইনি তখন। পকেটে হাত দিতেই হৃৎপিণ্ড ঠাণ্ডা হয়ে গেলো। বহুদিনের পুরাতন প্যান্ট। পকেট ছিড়ে গেছে। যে টাকা রেখেছিলাম ওটা ওদিক দিয়ে কোথায় যে পড়েছে আল্লাহ্ জানেন। এখন কি করব? এখান থেকেই কেটে পড়বো কি না ভাবছি। অনেক বাকি এমনিতেই হয়ে আছে আগে থেকেই।

(টাটা। আজ এ পর্যন্তই ……। ভুল থাকলে ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। কেননা সাহিত্য চর্চায় আমি কাঁচা)

error: Content is protected !!

Powered by themekiller.com