Breaking News
Home / Breaking News / কবি জব্বার হোসেন এর কবিতা “শেষ পথ”

কবি জব্বার হোসেন এর কবিতা “শেষ পথ”

“শেষ পথ”
জব্বর হোসেন
—————————–
—————————–

যেখানে থাকার কথা ছিল
সেখানে তুমি ছিলে না,
হতে পারে আমার পৌঁছনোর আগেই
তুমি বিকল্প কোন পথ ধরে
এথেন্সের অচেনা গলিতে আমাকে খুঁজতে গিয়ে
ভুল করে অন্য কোথাও বসে আছো
অভিমানের বোরখায় মুখ ঢেকে।

হয়তো আমি, নাও যেতে পারি
এই দুর্ভাবনায় ডুবে ডুবে সারারাত
অনিশ্চিত জীবনের ছায়ান্ধকারে
ফেলে গেছো বেদনার রুপোলি কস
আর অশ্রুস্নাত হয়েছো বারবার।

পৌঁছনোর পরই দেখি জনমানুষের চিহ্ন নেই
দু-একটা ফৌজি কুকুর জামার ঘাম শুঁকে শুঁকে
চলে গেল বহুদূরে, মাঝে মাঝে জোনাকিরা
নিভু নিভু আলোয় দেখে নিচ্ছে আমার মুখ,
আমি কি তবে ভুল করে অন্য কোনো রাস্তায়
কিংবা অন্য কোনো ঠিকানায় চলে এলাম!

না, সব তো ঠিকই আছে
পাহাড়ের পাদদেশে প্রাচীন ছাতিম গাছ
ছড়ানো ছিটানো পাঁচ দশটা সেগুন
অনবরত কলরব করে যাওয়া অচিন পাখি
ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক, লোমোশ শিয়ালের
ধারালো দাঁতের ডগায় রক্তের দাগ
বড়ো বড়ো প্রাগৈতিহাসিক পাথরের চাঁই,
যত্র তত্র গুহাবাসী তপস্বিনীদের হরিনাম
সর্বোপরি জ‍্যোৎস্না খাওয়া ঝরনাধারা
হৃদয়ে বয়ে যাওয়া নিরবিচ্ছিন্ন স্রোতের মতো
নিরলস ঝরিয়ে চলছে বুকফাটা আর্তনাদ।

রাত গভীর হয়ে আঁধারের ঘোমটায় ঢাকছে সতর
তীব্রতর হয়ে উঠছে রক্তমুখো শেয়ালের ডাক
ইতস্তত ঘোরাঘুরি করছে পাহাড়ি হায়েনার দল
ওদের জিভগুলো লকলক করছে
চোখের ভেতর ঘুরে বেড়াচ্ছে অনন্ত ক্ষুধা
লম্বা লম্বা গাছের শাখা থেকে উড়ে আসছে
হরেকরকম অচেনা বরফের বাদুড়
তীব্রতম উত্তরা বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে হিম
অবশ মূর্তির মতো, মৃত্যুর গভীর সন্নিকটে
আর কতক্ষণ অপেক্ষায় থাকি প্রিয়তমা!

আস্তে আস্তে ভোরের আলোকরশ্মি
সাফ করে দিল আঁধারের দেওয়াল
খুলে গেল সব গুহাদ্বার, এখান থেকে
সুড়ঙ্গের পথ ধরে গেলে, মাত্র বাহাত্তর কিমি দূরে
পৃথিবীর প্রাচীনতম সভ‍্যতার শহর এথেন্স,
সাদা বরফের উপর পাথরের সরু রাস্তা পেরিয়ে
প্রায় সন্ধ্যার কাছাকাছি এথেন্সে পৌঁছনোর পর
ভাবছি, এখান থেকে ম‍্যাসিডন আর কতদূর!
দেখার ইচ্ছে ছিল আলেকজান্ডারের সমাধি।

ল‍্যাম্পপোষ্টের আলোর বন‍্যায় শুয়ে আছি
দু:স্বপ্নের ভেজা বালিশে মাথা, চোখের তারায় সহস্র কোটি জোনাকি, এই এসে জ্বালাবে বাতি
পরক্ষণেই আলো নিভে যায়, হতাশার পর্দায়
ফুটে ওঠে তোমাকে না পাওয়ার যন্ত্রণা।

মধ‍্যরাত, গোটা এথেন্স এখন লেপের তলায়
জন্ম মৃত্যুর উষ্ণতা মাখতে মাখতে
অবচেতনার ইন্টারনেটে আঁকছে দর্শনের কোলাজ,
ভালোবাসার উষ্ণতামাখা ইথার তরঙ্গের কণায়
ভেসে ওঠে বাদামী অক্ষরে লেখা জীবনের স্লোগান।

আগুনে ঝলসানো রাজধানীর হৃদয়স্পন্দনে
বেজেই চলেছে মর্মস্পর্শী পিয়ানোর সুর,
সভ‍্যতার জন্ম পিঠস্থানে,দুরাশার কবরখানায় বসে
আমি এঁকেই চলেছি শেষ পথের স্কেচ।

আমি যেন উদ‍্যেশ‍্যহীন লক্ষহীন এক আদিম যাযাবর, ঠিকানাহীন চালচুলোহীন নিরস বিশ্বমাঝে
এলোপাতাড়ি অনাসৃষ্টির কলসে ঢালছি
সোমত্ত কুমারীর কুয়াশামাখা ঠোঁটের মুগ্ধতা।

গুঁড়া গুঁড়া আঁধার আর লিহিলিহি আলোর পথে
খুঁজেই চলেছি দিগ্বিদিক, মেঘের আড়ালে যদি
লুকিয়ে থাকে চুপিচুপি, অশান্ত দুর্যোগের ঘনঘটায়
বিহঙ্গেরা ঠোঁটের ভিতর লুকায় শাবক,
আলো আঁধারের তলপেটে, হরিণী মাখামাখি করে
মৈথুনের সোহাগ, একই শরীরে ছুটে চলে—-
দুইটি নদীর স্রোত, সদা জাগ্রত তরল আর
রুধিরে বাষ্পীভূত জীবন্মৃত‍্যূর সজীব নিউরোন।

এথেন্সের রাজপথ, প্রতিটি বন্দর, স্টেশনের
অলিগলি, প্রেক্ষাগৃহ, সমুদ্র বন্দর
আলোর পিছনে থাকা গোটা শহর
তন্নতন্ন করে ঘেঁটে, যখন আমি গন্তব্যের শেষ সীমানায়, ঝাঁপসা দৃষ্টিতে বাঁধছি শেষ পথ,
হঠাৎ চেনা শব্দের ভূপতিত রনধ্বনি
ছড়িয়ে পড়লো রামধনুর বর্ণচ্ছটায়!

নিষ্পেষিত হৃদয়ের তরল আনন্দ লাভায়
ধুয়ে মুছে সাফ হয়ে গেলো বিরহের মলিনতা,
পথের প্রান্তে বাজে শেষের অতলান্তিক বাঁশি,
অনন্ত উদভ্রান্তের পথে ছুটে জিব্রাইলের ঘোড়া,
পুষ্পমাল্য পাঞ্চজন‍্যে আলোড়িত সীমান্তের
শেষ অতিথি বাজায় মিলনের সুর,
এথেন্সের খোলা আকাশে উড়ে রঙিন বেলুন।
আমার অন্তিম শ্বাসের ভেতর, তখন ছুটছে
আদিমতম ভালোবাসার আদম সন্তান।

error: Content is protected !!

Powered by themekiller.com