Breaking News
Home / Breaking News / পশ্চিমবঙ্গের বিশিষ্ট কবি অনমিত্র স্যানাল এর অসাধারন কবিতা “মূল্যবোধ”

পশ্চিমবঙ্গের বিশিষ্ট কবি অনমিত্র স্যানাল এর অসাধারন কবিতা “মূল্যবোধ”

মূল্যবোধ

অনমিত্র সান‍্যাল

বাবারা ভীষণ স্বতন্ত্র হয়,
নদী-বালি-হৃদয়ের উদ্ঘাটিত দিগন্তের মতো নিঃসঙ্গ।
তবুও শিশুরা সবটুকু বাবার সঙ্গেই ভাগ করতে চায়…
আনন্দের ফুলঝুরি,ভয়ার্ত সন্ধ্যা ,সর্পিল রাস্তা…
থমকে যাওয়া ভীড় কিম্বা বাজপড়া ভীষণ বিকেল
এমনকি বিমর্ষ অণ্ধকারটুকুও….
কবিতার অক্ষয় আলোয় বাঁচতে চায়
আবশ্যিক একাগ্রতা…
ছিন্ন অভিমানে ,তীব্রতার নির্মল সততায়।

বাবার কর্পোরেট জীবনের রাগ ঘেন্না,উচ্চাকাঙ্ক্ষার…
কোমোল ছাঁকনিতে …কত যে প্রতারক,ধান্দাবাজ….
কৃতঘ্নতার হিজড়ে বাহিনী…শিশুরা জানেনা…অত-
লান্তিক নোনা জলের গূঢ় সত্য,কর্দমাক্ত নগ্নতা…
বাবারাও হিসেব রাখে না,শিশুর বুকের মধ্যে
নির্জন নদীর কুলকুল শব্দ…..
যেখানে জলপরীরা ভীড় করে থাকে,
আহ্লাদী মেয়ের মতো…
পানকৌড়ি ডুব দেয়,হীরে-মানিক খোঁজে….
সেখানে সে কাগজের নৌকো ভাসায়…
তার খবর কে রাখে ?
ছোট্টো আবেগ,দুঃখ,সুখ নিমেষে ফালাফালা হয়….উচ্চাকাঙ্ক্ষার তীক্ষ্ণ ছুরির ডগায়,
ভারি নরম কোমল সে সব,বাবারা জানে না।

পাখির ডানায় ভর করে উড়ে যায় মন…
পেন্সিলের সীসে ফুটে ওঠে পদ্ম,গোলাপ,নারকেল
পাতার সন্দিগ্ধ কোলাজ….
তাই ছেলেটা যখন ফ্লুরোসেন্ট নীল গাড়িটার সামনে
এসে দাঁড়ালো….
বাবা তখন জল ঢ়ালছে গাড়ির কাঁচে বনেটে।
শৈলেন-কে হারিয়ে দিতেই হবে,বড্ড কেউকেটা
মনে করে নিজেকে…
ওর হাস্যকর অহঙ্কারের জবাবেই এই গাড়ি,ইম্পোটের্ড…শিশুটি সে খবর রাখে না…
সে থাকে তার নিজস্ব গোলার্ধে,মগ্ন নক্ষত্রের মতো…
নৈসর্গিক সারল্যে।

শৈলেনের ছেলে ডেভিড শিশুটির বন্ধু,বাবার গাড়িতে
কাগজের চাঁদোয়ায় “ আই লাভ ইউ ড্যাড ”লিখে
কাল-ই সে ক্যাডবেরী পেয়েছে।
দাদার কাঁটাকম্পাস চুরি করে…ডেভিড হয়ে ওঠার
দূর্নিবার ইচ্ছে তার…
হঠাৎ ধাতব শব্দে সম্বিত ফিরলো বাবার…
কর্পোরেট চৌকাঠে হোঁচট খেয়ে…
হাতের লোহার পাইপ-টা আচম্বিতে নেমে এল
কচি হাতটার ওপর।
টাল সামলাতে পারল না ছোট্ট শরীরটা,লুটিয়ে পড়ল
মাটিতে ….
জাপ্টে ধরল বাবা,ভেসে গেল রক্তে,সারা শরীর,
মুখ,চোখ,বুক…

প্রতিবেশীরা ছুটে এসেছিল..সমষ্টির প্রেক্ষাপটে…
মা,কাকু,ঠাম্মা ,জ্যেঠু…
বাবার চোখে জল দেখে চিত্রার্পিত তারা ….
পটে আঁকা ছবির মতোই হিমচিত্র….
যেন ক্যানভাসে লগ্ন মুখ,
যেন ঈজেলের বাঙ্ময় স্হিরচিত্র

হাসপাতালের নাতিদীর্ঘ বিছানায় শুয়ে নক্ষত্র রেখার
মতো প্রতিষ্ঠিত স্বীকারোক্তি,“ বাবা আমি আর গাড়ির উপর লিখব না।”
ডাক্তার-রা অস্ত্রপচার করে চারটে আঙুল বাদ দিল
যেদিন…
সেদিন রাত্রেই বাবার স্বতন্ত্রতা টুকরো হোলো,
গাড়ির দরজায় আলতো ছোঁয়ায় লেখা…..
“বাবা আমি তোমায় ভীষন ভালোবাসি….”

error: Content is protected !!

Powered by themekiller.com